ইসলামে রাজনীতি


শব্দ বা পরিভাষা সময়ের পরিক্রমায় তার আবেদন হারিয়ে দূর্বল, জীর্ণ-শীর্ণ নূজ্য এমনকি  অনেক সময় মৌলিক আবেদন হারিয়ে উল্টো বিকৃত অর্থ, অনুভব ও অনুভূতি প্রদান করে। এই বিকৃতির সবচেয়ে  বেশি শিকার সম্ভবত 'রাজনীতি' শব্দটি। রাজনীতি একটি পজিটিভ ও বহুমুখী শব্দ। বাংলায় যাকে আমরা রাজনীতি বলে থাকি তার মৌলিক দর্শন হলো মানুষকে  নৈরাজ্য থেকে উদ্ধার করে একটি একক চেতনায়- সেটা জাতি হোক বা ভাষা হোক কিংবা সেটা ধর্ম হোক- উদ্বুদ্ধ কোন জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী কোন দল এমন কোন নিয়ম-নীতি বা তন্ত্রের চর্চা করে যার ফলে ঐ জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণ সাধিত হয়। রাজনীতির সবচেয়ে সহজ  দর্শন হলো মানুষের সমন্বিত, সার্বিক ও চিরস্থায়ী কল্যাণ করা। এটা বাস্তবায়নের  জন্য বাস্তবিক ও কার্যকর পন্থা একটি নেতৃত্ব। 


এছাড়া শব্দগতভাবে 'রাজনীতি'  বলতে বুঝি নীতির রাজা অর্থাৎ নীতিসমূহের মধ্যে যে সব নীতি সবচেয়ে উত্তম  যা মানব সমাজের এমনকি গোটা পৃথিবী নামক গ্রহের জন্য  সবচেয়ে উপযোগী এবং একমাত্র আল্লাহ পাকের আরাধনা ও সন্তুষ্টি বিধানের জন্য জীবনচর্চার  নীতিগুলোকে রাজনীতি বলতে পারি।  এভাবে রাজ-নীতিকে বুঝলে  ইসলামকে রাজনীতি বলা অনেকটাই বাঞ্ছনীয়। আবার অনেকে বলবে ইসলাম এই পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা ঠিক নয় কারণ ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা।  অবশ্যই এ কথা ঠিক কিন্তু  নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামকে রাজনীতি বলতে চাচ্ছি কারণ রাজনীতি ও ইসলামের মৌলিক জীবনদর্শন এক‌ই অর্থাৎ মানব কল্যাণ। আল্লাহ তাঁর  কিতাবে একথাই বলেছেন- 

সূরা আল ইমরান (آل عمران), আয়াত: ১১০

کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَتَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَتُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ ؕ 

অর্থঃ তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।


তবে আমি মোটেও পশ্চিমা থেকে ধার করা রাজনীতি ও রাজনৈতিক চর্চার কথা বলছি না বরং ইসলাম যে একটি শাশ্বত রাজনীতি সেটাই বলার চেষ্টা করছি।  নিশ্চয় এই রাজনীতির রূপরেখা ও চর্চা  এর নিজস্ব লক্ষ্যে ও ঢঙে হবে।  ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে চারটি স্তম্ভ যথা নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জ্ব ‘ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ ও ঐক্যবোধ সৃষ্টি করে’।–[ হামিদ এনায়েত, Modern Islamic Political Thought, (লন্ডন, ম্যাকমিলান, ১৯৮২) পৃঃ ২] ইসলামের এ স্তম্ভগুলোর উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তির আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা সাধন নয় বরং এর আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক তাৎপর্য রয়েছে। এ সব স্তম্ভসমূহ মানুষের আচরণ ও কার্যকলাপের সাথে ঘনিষ্টভাবে সংযুক্ত। নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বাসীদের জন্য যে নামাজ ফরজ করা হয়েছে (৪:১০৩), জামায়াতের সাথে যা আদায় করা বিধেয়, সে নামাজের মাধ্যমে একজন ঈমানদার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে যাতে রয়েছে চিন্তন, আবেগগত অনুপ্রেরণা ও শারীরিক সঞ্চালন। নামাজে বিশ্বাসী মানুষেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, নামাজ আদায়ের জন্য একজনকে ইমাম নির্বাচিত করা হয়, মহান আল্লাহর মহিমা ঘোষণা; করে নামাজীরা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে প্রার্থনা করে, ‘হে প্রভু, আমাদের সরল সঠিক পথ দেখাও’। নামাজের প্রার্থনার মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে কল্যাণময় জীবনের নীতিমালা, সামাজিক ন্যায্যতা ও অধিকার, নেতৃত্ব ও আনুগত্য, দায়িত্ববোধ ও দায়িত্ব সচেতনতা এবং বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব। 


ইসলামী আত্মিক বা নৈতিক মূল্যবোধ রাজনীতির নির্দেশনা ও গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় এবং রাজনৈতিক আচরণ বিধি ইসলামের আদর্শিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ হতে উৎসারিত। তাই রাজনীতির মুখ্য বিষয়সমূহ তথা আদল এবং ইহসান প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা বিধান করবে এমন ন্যায়পরায়নদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ, মন্দের শিকড় উৎপাটন করে কল্যাণকর জীবন প্রতিষ্ঠা-এসব কিছুই ইসলামের প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং ইসলাম এসব কিছুকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। এ সমস্ত কর্মকাণ্ডকে ইসলাম মৌলিক গুরুত্ব প্রদান করে, তবে পার্থক্য এটুকু যে, এ সমস্ত কিছু তথা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ইসলামের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের মূল ও বিস্তৃত কাঠামোর ভিতরে সংঘটিত হতে হবে। ধর্ম ও রাজনীতি তাই ‘একই ইসলামী মুদ্রার দু’পিঠ’-নয়। –[ জি.এইচ জ্যানসেন, ‘Militant Islam’ (লন্ডন, প্যান বুকস, ১৯৭৯), পৃঃ ১৭] তাদেরকে এমনভঅবে বিন্যস্ত করা যায় না যে, একটি স্বাধীন সত্তা এবং একটি অন্যটির উপর নির্ভরশীল। ইকবালের ভাষায় প্রকৃত সত্য এই যে ‘ইসলাম হচ্ছে দ্ব্যর্থহীনভাবে একক বাস্তব সত্য নীতি, যা সুস্পষ্টভাবে এক ও অভিন্ন, যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন’।–[ স্যার মোহাম্মদ ইকবাল, The Reconstruction of Religious Thought in Islam’ (লাহোর, শেখ মোহাম্মদ আশরাফ, ১৯৭১), পৃঃ ১৫৪]।


এই ইসলাম বা ইসলামের রাজনীতি সময়ের পরিক্রমায়    আবেদন, আস্থা বা মোলিক সৌন্দর্য  মেঘে ঢাকা পড়েছে যার দায় মোটেও ইসলাম বা ইসলামের রাজনীতির নয় বরং এর দায় যারা ইসলাম বা ইসলামের রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। খোলাফয়ে রাশিদাগণ রাজনীতির যে সত্যিকার শাশ্বত সৌন্দর্য, মানবিকতা, আদল ও ইহসান পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিলেন তা সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিতে   এমন কিছুলোক এটা ধারন করেছিলেল তাদের সেচ্ছাচারিতা, বিলাসিতা, জুলুম, পারিবারতান্ত্রিকতা ও   দীনহীনতা  ইসলাম বা রাজনীতির এই পরিভাষা দূর্বল, জীর্ণ শীর্ণ  হয়ে  মানুষের কাছে আবেদন ও আস্থা  হারিয়েছে। যে ইসলাম গোটা পৃথিবীর পিপাসা মিটিয়েছে সেই ইসলাম থেকে  মানুষ মুখ ফিরিয়ে বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্র তৈরি করেছে। এমনকি বেশিরভাগ মুসলমান কিছু আচার এবং আনুষ্ঠানিকতাকে ইসলাম মনে করে। এসবের মৌলিক কারণ পরবর্তিতে যারা ইসলামকে ধারন করেছে তাদের কাছেই ইসলামের সমন্বিত রুপ হারিয়েছে। তাদের কাছ থেকেই আমরা বুঝেছি ইসলাম শুধু ব্যক্তি ও মসজিদ কেন্দ্রিক যদিও 95% এর বেশি মুসলমান নিয়মিত মসজিদে যায় না। আমার সবচেয়ে দূর্ভাগ্যের প্রশ্ন হলো মুসলমান কেমন করে শাশ্বত সুন্দর ইসলামকে থেকে বিমুখ হলো? এর দায় কোন ক্রমেই এড়াতে পারবে না যারা ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে। এভাবেই শব্দ বা পরিভাষা ব্যক্তিদের কারণে তার আবেদন হারিয়ে ফেলে আবার কিছু ব্যক্তিরাই এই পরিভাষায় হারোনো যৌবন ফিরিয়ে নিয়ে আসে, নতুন করে তরঙ্গায়িত করে। ফিরে পায় তার সত্যিকার রূপ ও যৌবন।  এই জন্য‌ই আল্লাহ প্রতি শতাব্দীতে একজন মুজাদ্দিদ পাঠান যিনি ইসলামের পরিভাষায় হারানো আবেদন ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। 


ইসলাম ও রাজনীতির সবচেয়ে আদর্শিক সম্পৃক্ততার উদাহরণ হচ্ছে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা), যাকে কুরআন সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে (উসওয়াহ হাসানা ৩৩ : ২১)। অন্যান্য বিষয়াবলীর মধ্যে তাঁর মদীনায় হিজরতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ক্ষমতা-সম্পর্কের পুনর্গঠন করে ঐশী ইচ্ছার অনুবর্তী করা। এখানেই ইসলামের প্রথম রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, যার বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক প্রধান ছিলেন মহানবী মোহাম্মদ (সা)।তিনি নামাজের ইমামতি করতেন, জি-হা-দ পরিচালনা করতেন, বিচারক হিসাবে কাজ করতেন এবং জ্ঞান, নীতির পরিমাপ  নির্ধারণ করতেন। সঠিক পথে পরিচালিত খোলাফায়ে রাশেদা তাঁদের শাসনকালে মহানবী (সা) কে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসরণ করেছিলেন। উম্মাহর নেতা হিসানে তিনি শরীয়াহ বাস্তবায়ন করতেন, ধর্মীয় আদর্শ পূর্ণভাবে সংরক্ষণ ও সমুন্নত এবং এর বিশুদ্ধতা বজায় রাখতেন। তৃতীয় খলিফা উসমানের সময় ইসলামী সভ্যতা ‘প্রাচ্য হতে পশ্চিমের আটলান্টিক মহাসাগরের তীর’ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।–[ Marshall Hodgson, The venture of Islam Conscience and History in A World of Civilization’ (শিকাগো, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস, ১৯৭৪), ভলিউম-১।


আমরা যদি পৃথিবীর মানুষকে সত্যিকার পিপাসা মিটাতে চাই আমাদেরকে ধারণ করতে হবে ইসলামের সমন্বিত ও পরিপূর্ণ শাশ্বত সৌন্দর্য। আমাদেকে সাজাতে হবে রাসুল (সাঃ) ও সঙ্গিদের চেতনায়, বোধে, লক্ষ্যে এমনকি তাঁদের সমগ্র আত্মিক ও বাহ্যিক সংস্কৃতিতে। আমাদের জীবন বাজি রাখতে হবে প্রত্যেক মানুষের কল্যাণের জন্য। আমাদের কেঁদে উঠতে হবে একজনেরও কান্নার জন্য, হেসে উঠতে যে কার‌ও হাসি দেখে। সবাইকে শিখাতে হবে সত্যিকার হাসি-কান্না কিসে?! আধুনিক মানব  সভ্যতাকে উদ্ধার করতে হবে সংকীর্ণতার চোরাবালি থেকে। এই সভ্যতাকে উদ্ধার করতে হবে মানুষ মানুষের নির্মম গোলামি থেকে মহান রবের আনুগত্যের দিকে। এটা সম্ভব হবে যখন আমরা ইসলাম সত্যিকার ধারক ও নমুনা হতে পারব। আর এটাই ইসলামের রাজনীতি।

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক
Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

আমি ও আমার আঁকা রাসুলে কারিম


 আমি হতে চেয়েছিলাম তোমার দূর ভালবাসার এক মহানায়ক! আমি তোমার অপরুপ সুন্দরের পল্লব হয়ে  পূরস্ফুটিত হতে চেয়েছিলাম। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম তুমি ছিলে সত্যিই মানব সৌন্দর্যের পরিপূর্ণ সত্ত্বা। আমি দেখাতে পারিনি তাতে কি ? এই পৃথিবীর ও  মানবতার যতটুকু সুন্দর ধারন করে আছে এর সবটুকুই তোমার সৌন্দর্য থেকে প্রতিফলিত হয়ে ঠিকরে আসা সুন্দরের আভা। তোমার নূর ছাড়া এই পৃথিবী নামক গ্রহ শুধুই একটি কৃষ্ণপিন্ড এবং এর অধিবাসীরা হবে দুপায়ে হিংস্র দানব।

আমি হতে পারিনি সত্যের মূর্ত প্রতীক। আমি কেমন করে বলব আমি তোমাকে ভালবাসি! তুমি কখনো কোন অবস্থায় মিথ্যা বলোনি আমার জীবন মিথ্যা দিয়ে  মোড়ানো। তুমি ছিলে ছাদেকুল আমিন আর আমি প্রায় সব আমনতের খেয়ানত করেছি-আমার সময়, মেধা, যোগ্যতা, ভালবাসা, পঞ্চ‌ইন্দ্রিয় এমনকি হৃদয়ের সব গুণাবলির খেয়ানত করে চলেছি। মানুষের আমানত সেতো দূরকি বাত! আমাকে মনে করতে হবে আমি কোন আমানত রক্ষা করেছি। তারপর‌ও আমি দাবী করব আমি তোমাকে ভালবাসি? এর চেয়ে হীনতা ও নিচুতা আর কি হতে পারে?

তোমার সত্যের প্রতি অটলতা ছিলো হিমালয়ের অধিক ।তুমি সত্য ও সুন্দরের কি না বাজি রেখেছ! ‌একহাতে চন্দ্র আরেক হাতে সূর্যের বিনিময়ে সত্যের সাথে বিন্দুমাত্র আপোষ করোনি। আমার পুরো জীবন অসত্য,অন্যায়, আনাচারের সাধে আমার কুটুম্বিতা। যদি কাপুরুষতায় কোন নবেল থাকত সেই মুকুট বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় আমি জয়লাভ করতাম। আমি কেমন করে দাবী করব আমি তোমাকে ভালবাসি?

তুমি ছিলে আখলাকের পূরিপূর্ণ সত্ত্বা। তোমাকে দিয়ে আল্লাহ মানবের আখলাকের পরিপূর্ণতা দিয়েছেন। তুমি গোলাপের পাপড়ির চেয়ে কোমল-মনোরম। তুমি নিজের স্বার্থে কখনো কাউকে আঘাত করোনি। আর আমি বিচ্ছুর চেয়েও স্বার্থপর ও হিংস্র। আমার বদ আখলাকির বিষবাষ্প কাকে গ্রাস করেনি? এটা কি ভালবাসার নমুনা?

তুমি ছিলে সত্যিকার মানব সমাজের রুপকার। তুমি ছিলে গোটা জগতের আশীর্বাদ। মানবতার সত্যিকার রুপ তুমি পুরস্ফটিত করেছিলে। মানব সভ্যতার এই মালাকে তুমি গেঁথেছিলে হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে। তোমার  জীবনের সবকিছু বাজি রেখেছিলে মানুষের চির স্বাধীনতার  ও মুক্তির। আর আমার জীবনে সব প্রচেষ্টা আবর্তিত হয়েছে পেট কেন্দ্র করে। আর আমি তোমার ভালবাসা দাবী করি!! ওহ কপটতা! তুমি নিজেই আমার কাছে পানাহ চাও!

স্বয়ং আল্লাহ তোমাকে স্বকৃতি দিয়েছে তুমি কোন কিছুই নিজের খেয়াল-খুশিতে কর না। তোমার সব সত্ত্বা জুড়ে ছিলো আল্লাহর ভালবাসা আর সেই ভালবাসার পরিচয়, স্বরুপ, গভীরতা ও পরিব্যপ্তি আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারে না।  আল্লাহর ভালবাসায় না দিবা-রজনী অতিবাহিত হয়, না কিয়ামে আমার পা ফেটে যায়, ফুলে যায়, না সুজুদে আমার শ্মশ্রু অশ্রুসিক্ত হয়, না মানুষের কল্যাণের জন্য উপবাসে জীবন কাটে। আমার সব কাজের মৌলিক প্রেষণা আমার বিকৃত মানব রুচির পরিতৃপ্তি।  এমনকি ইবাদত, দাওয়াত ও দীনের নামে যা কিছু করি এগুলো একটিও রবের একনিষ্ট ভালবাসায় নয় বরং বখে যাওয়া মনের চাহিদা সস্তায় সদয় করার জন্য।  হে রবের ভালবাসা! আমি কেমন করে দাবি করব আমি তোমাকে ভালবাসি?

আমি জানি আমার অযোগ্যতা কিন্তু হে আল্লাহর হাবিব  আমি তোমাকে ভালবাসতে চাই আমার সত্ত্বার সবটুকুই দিয়ে। আমি ছোট্ট স্রোতস্বিনী হয়ে বিলীন হতে চাই তোমার সাগরের বুকে। আমি তোমাকে ধারন করতে চাই আমার ভালবাসার শক্তিতে, সহসে এবং আকাঙ্খায়। হে আল্লাহ ! তুমি সহজ করে দাও ও কবুল করো আমাকে। আমিন।

আল্লাহুম্মা সল্লিআলা মহাম্মদ দায়িমান - আবাদান।

Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

ভাষা ও প্রজ্ঞার স্বরুপ, সম্পর্কের বিশালতা ও আমাদের বিচ্ছিন্নতা


পৃথিবীতে মানুষই হলো একমাত্র প্রাণী যাদের ভাষা আছে, এই ভাষার কারণে আমরা অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা। কিন্তু আমাদের হাসি, কান্না, খাওয়া,ঘুম,ভালবাসা ও ঘৃণার ভাষা বলা যায় এক‌ই রকম। আমাদের অনুভূতি, অনুভব, চিন্তা, চেতনা, আবেগ ইত্যাদি প্রকাশ, প্রক্রিয়াজাত ও নতুন সৃষ্টিশীলতা সব কিছুই আমরা করি ভাষার মাধ্যমে। 

যদিও আমাদের সাধারণ কর্মকাণ্ডগুলার ভাষা একই, কিন্তু আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ভাষায়,বিভিন্ন অনুভূতিতে,বিভিন্ন সংস্কৃতিতে অন্যেদের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় অবতীর্ণ হ‌ই। আমরা বেশীরভাগ সময় আমরা ভাষা দিয়াই একে অন্যের সাথে যোগাযোগ, জানা,  বোঝা ও শিক্ষার  চেষ্টা করি, কিন্তু ভাষা দিয়া সম্পূর্ণ জানা,বোঝা, চিন্তা ও হৃদয়ঙ্গম করা কখনই হয়ে উঠে না। লেখক যেমন আবেগ, অনুভব, অনুভূতি সম্পূর্ণরূপে ভাষার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারে না ঠিক তেমনি লেখকের ভাষা পাঠক পুরাপুরি বুঝে উঠতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে ভাষা দিয়ে যেটা বোঝাতে চাওয়া হয় তার উল্টো বোঝে। আবার  মানুষের চিন্তা, চেতনা,  অনুভূতিগুলো ভাষার মাধ্যমে পরিমাপ নির্ধারণ করা যায় না। এমনকি একটি ভাষা বা উপভাষা  অপর একটি ভাষা বা উপভাষাকে কখনোই ধারন করতে পারে না। এভাবেই শুরু হয় পারিবারিক, সামাজিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চিন্তা, চেতন, শিক্ষা ও রুচির গ্যাপ। এখন এই সমস্যা মানুষের ভাষা ভিন্ন অথবা ডায়ালেক্ট ভিন্ন হওয়ার কারণে হয় না। মূল সমস্যাটা হইলো, পৃথিবীর কোন ভাষা অথবা কোন ডায়ালেক্ট  মানুষের এই বাস্তবতাকে এক্স্যাক্টলি বর্ণনা করতে পারবে না। এইটাই ভাষার সীমাবদ্ধতা। 

পৃথিবীর সব মানুষের কান্না বা হাসির রুপ এক‌ই কিন্তু  যখন‌ই এটা শব্দে বা ভাষায় বর্ণনা করা হয়  তখন হাজার মানুষের কাছে হাজার রুপে ধরা দেয়। আবার বিভিন্ন  ভাষার বিভিন্ন  পরিভাষার রুপ, গভীরতা ও আবেদন আবহাওয়া, সমাজ, সংস্কৃতি, সময়,  কাল,  ব্যক্তি,বয়স, অভ্যাস, রুচি, লিঙ্গ, ধর্ম, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমরা যেই বাস্তবতায় বসবাস করি তাঁর খুব অল্পই ভাষা দিয়া বর্ণনা করা যায় এবং একে অন্যের সাথে যে ভাবের আদান প্রদান, শিক্ষাদীক্ষা করতে চাই তাও খুবই অল্প ভাষা দিয়া করা যায়। সেই জন্যেই আমরা আবেগের আতিশয্যে বেশির ভাগ  ক্ষেত্রে আমরা ভাষাহীন হয়ে পড়ি। কারণ সেই আবেগ প্রকাশ করার ভাষা আসলেই নাই।  ভাষা হলো কিছু শব্দের সমষ্টি। আর এই শব্দগুলা হলো মানবের অতলান্তিক মনের অনুভূতি, রহস্য ও প্রজ্ঞা বর্ণনা করার জন্যে ব্যবহৃত সিম্বল। এই সিম্বলগুলা দিয়া মানব মনের বা সমাজের একটা আবছা অবয়ব বর্ণনা করা গেলেও, পরিষ্কার চিত্রটা কখনই তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাইলে কি ভাষা দিয়া কিছুতেই সত্যিকার ভাবের আদান প্রদান সম্ভব না? যুগ যুগ ধরে মানুষ তাহলে কি করে আসতেছে? উত্তর হইলো, ভাষা শুধু বাস্তব পৃথিবীতে সাইন পোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হইতে পারে, এবং সেইটাই হয়ে আসিতেছে। এই সাইন পোস্ট দিয়া অনেকটা পূর্ণ কমুনিকেশন বা বোঝা তখনই সম্ভব, যখন মানুষ একে অন্যের সাথে হারমনিয়াসলি কানেক্টেড থাকে বা গভীর আত্মিক সুসম্পর্কে আবদ্ধ  হয় যেইখানে তাঁরা শব্দের ব্যবহার ছাড়া অথবা শব্দের বাইরে গিয়া একে অপরের মনের ভাষা বুঝতে পারে। এমনকি  যারা নীরব কথোপকথনের ঝরনা ধারায় আপ্লুত হতে পারে। মানুষের প্রজ্ঞা আর ভালোবাসা মূলত এইভাবেই প্রসারিত করা হয়। আর এভাবেই  মানুষ ভাষার কাঠামোকে ভেঙে অবতীর্ণ হয় নতুন সম্পর্কের বিশালতায়।

কিন্তু সমস্যা হলো, বেশীরভাগ মানুষ অজ্ঞতা আর ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়াতে, মানুষ এই  সম্পর্কের বিশালতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিশলতার কথা ভুলে গেছে। মানুষ এখন এপারেন্ট ভাষাটাকেই বিশাল বাস্তবতা মনে করে। সারা পৃথিবীতে মানুষ সারাক্ষণ শুধু বকবক করে। সবাই কথা বলেই চলেছে। আর এনটায়ার হিউম্যান রেইসের এই টকেটিভন্যাসকে বলা যায় “ল্যাক অব রিয়েল ইনটারেকশ্যান”। সবাই একে অন্যের সাথে ভাবের আদান প্রদান, জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান দান করার সময় ভাষার মাধ্যমে একটা কল্পিত লক্ষ্যহীন অন্তঃসার শূন্য  একটা বিশেষ কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, এই কাঠামো খুব সহজেই তার লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে দীনি শিক্ষা অথবা নৈতিক শিক্ষা যেটার সম্পর্ক মানুষের আভ্যন্তরীণ পরিচর্যার সাথে সেটা শুধু ভাষার কাঠামোতে আবদ্ধ করলে এই শিক্ষা সম্পূর্ণ লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়বে। ফলস্বরুপ জন্ম নিবে প্রাণহীন পৃথিবী। 

এইরকম যখন চলতে থাকে, মানুষ যখন ভাষাকেই সব বাস্তবতার ধারক মনে করে, তখন সে মনের দিক থেকে অস্থির হয়ে উঠে। এই অস্থিরতায়  মানব সমাজকে নিক্ষেপ করে হতাশার অন্ধকারে। এখন তাহলে এই সমস্যার সমাধান কি? সমাধান হলো,  প্রথমে ভাষার ছলনা ও সীমাবদ্ধতাকে বোঝা। দ্বিতীয়ত,  নীরবতারে আপন করা, মাঝে মাঝে নীরবতায় ডুবে যাওয়া। আমরা নীরব থাকলে মহাবিশ্বের প্রবাহটা স্পষ্ট  শুনতে পাব। মহাবিশ্বের ছন্দটারে অনুভব করতে পারব। দিগন্তসমূহে আল্লাহর সাজানো আয়াত সমূহ  দেখতে ও বুঝতে সক্ষম হব। তখন আশেপাশে যা কিছু আছে এবং যারাই আছে, এই সবকিছুর সাথে আমাদের সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি হবে। আমরা তখন  পুরা মহাবিশ্বের সবকিছুর সাথে গভীর ছন্দ ও সম্পর্ক খুজে পাব।  এই সম্পর্ক কোন কথা দিয়া, অথবা ভাষা দিয়া তৈরি হয় না। বরং এই সম্পর্ক  আচার-‌আচরণ,  দায়িত্ব, কর্তব্য, ধৈর্য্য, মহানুভবতা ও ভালবাসা  ইত্যাদির মাধ্যমে রচিত হয়। ত্যাগ-তিতিক্ষা, নিঃস্বার্থপরতা, অভিসারতা এই সম্পর্কের মৌলিক ভাষা। আমাদের অসীম অস্তিত্ব, অনুভূতি, অনুভব ও প্রজ্ঞা  যদি শুধু  কথার কাঠামোতে সীমাবদ্ধ করে ফেলি এর চেয়ে দৈন্যতা আর কি হতে পারে!! 

এখন শেষ প্রশ্ন হইলো, এই যে এত কিছু বললাম। এর সবকিছুর মূল কালপ্রিট কি শুধু ভাষা? উত্তর হইলো, না। তবে ভাষা এইখানে বড় ধরণের ভূমিকা রাখে। সমস্যাটা প্রকট হইয়া দাঁড়ায় তখন, যখন আমরা ভুলে যাই যে ভাষা লিমিটেড। বিখ্যাত স্ক্রিন রাইটার কিম ক্রিজান ভাষার এই লিমিটেশন নিয়া কথা বলছিলেন। তিনি বলছিলেন —

"শুধু সারভাইবালের ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহারটা খুবই সহজ এবং কার্যকরী। যেমন ধরেন, পানি। এই শব্দটা শুনলে আমরা সবাই পানির সাথে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলাইয়া তারপরে বুঝতে পারি ‘পানি’ বলতে কি বুঝায়। কিন্তু বিষয়টা একটু প্যাচ খাইয়া যায় যখন আমরা ভাষার এই সিম্বলগুলা দিয়া কোন Abtract জিনিস বুঝাইতে চাই, যেমন প্রেম,ভালোবাসা, রাগ, ক্ষোভ, আধ্যাত্বিকতা ইত্যাদি। যখন কেউ বলে ‘ভালোবাসা’, তখন যে শুনে সে ভালোবাসার সাথে নিজের যে অভিজ্ঞতা সেইটা দিয়া বুঝে নেয় ভালোবাসা বলতে এখানে কি বুঝানো হইসে। কিন্তু সে কি এক্স্যাক্টলি ভালোবাসা দিয়া এইখানে কি বুঝানো হইছে তা বুঝল? বুঝলে সেইটা ক্যামনে নিশ্চিত হওয়া যাবে? শব্দ দিয়া তা নিশ্চিত হওয়া যাবে না কখনই। কারণ শব্দেরা নিষ্ক্রিয়। এইগুলা শুধুই সিম্বল। শব্দরা মৃত। আমাদের বেশীরভাগ অভিজ্ঞতাই দুর্বোধ্য। অকথ্য। কিন্তু তারপরেও আমরা যখন কথা বলি তখন মনে হয় আমরা কানেকটেড। মনে হয় আমরা একে অন্যের কথা বুঝতে পারছি। যদি এইরকম অনুভূতি হয়, এবং সেইটা যদি সত্যি হয়। তাইলে এইটারে বলা যায় “ফিলিং অব স্পিরিচুয়াল কমুনিয়ন”। এবং এইটার জন্যেই আমরা বাঁচে থাকি।

শেষ কথা হলো, ভাষা শুধুই সিম্বল। এইটা আমাদের সারভাইবালের জন্যে প্রয়োজন। ভাষার এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। ভুলে গেলেই সমস্যা, ভুল বোঝাবুঝি। ভাষার দরকার আছে বলে আল্লাহ মানুষকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন এবং এই জন্যেই আমি এই লেখাটাও ভাষা দিয়াই লিখতেছি। এবং ভবিষ্যতেও লেখব। কিন্তু ভাষা কেবলই ভাষা। এইটা তখনই প্রজ্ঞা ও অসীমানায় পরিণত হইব, যখন আমরা এইটার সাথে আমাদের অনেক কিছুই যেগুলো উপরের দিকে আলোচনা করেছি সেগুলো সহ আরও অজানা কিছু এঙ্গেজ করাতে পারব। তাছাড়া ভাষা কেবলই কতগুলা মৃত শব্দের সমষ্টি বৈ আর কিছুই না। ভাষার কাঠামো ছিন্ন করতে পারলেই আমরা ছোঁয়া পাব প্রজ্ঞা ও সম্পর্কের বিশালতায়!

Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

"আমি" কতখানি আমার!


 দীনের ময়দানে অনেক পথনির্দেশকগণ একথার তালিম দেন যে নিজেকে আগে শুদ্ধ করতে হবে বা নিজেকে জানতে হবে। কারণ নিজেকে চিনতে বা জানতে না পারলে আমাদের অনেক সমস্যাই সমাধানের অযোগ্য থেকে যাবে। কিন্তু নিজেকে  চেনার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন পথ বা পদ্ধতির কথা বলেন না। দুই-একজন  যা কিছু বলেন সেটা বড়ই গোঁজামিল ধরনের। নিজেকে চেনা বা জানার জন্য কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে হবে, আমাদের  অবচেতন মনের জগতের খোঁজ-খবর নিতে হবে।আমার রবের সাথে আমাদের সম্বন্ধ কি উদ্ধার করতে হবে । নিজের বাবা-মায়ের বিষয়ে আমাদের  অনুভূতিটা কেমন তা বোঝার চেষ্টা করা। একটু স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে বলুন নিজের অতীত জীবন সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিটা কেমন। যেসব কারণে আমরা রেগে যায় সেসবের একটা তালিকা কি আমাদের আছে বা আমাদের রাগের উৎসই-বা কী তা আমরা খোঁজার চেষ্টা করি?এছাড়া  ঐসব বিষয়ের এমন কোন সুভাবনা মনে কী বিরাজমান থাকে যেগুলো কীনা আমাদের  সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে? আমরা কী ভেবে দেখি যে কোন মুহূর্তগুলোতে আমরা অন্যের সঙ্গে খুবই স্বাভাবিক এবং কোন সময়টায় আমরা  অন্যের সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ করে ফেলি।

আচ্ছা, মানুষ হিসেবে আমরা সবাই নানা সময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভোগি। ভেবে দেখি এই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও চাপ মোকাবেলায় আমরা  কি সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করি, অর্থাৎ কোন্ আত্মোপলব্ধি এই বিভিন্ন  পরিস্থিতির  মোকাবিলা করি। কেউ আমাদের সমালোচনা করলে আমরা কী অনুভূতিতে গ্রহন করি এবং কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি? কোন কাজটি করতে আমরা  সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করি এবং এর পিছনে মূল চালিকা কী? অন্যের কোন বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের  সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে এবং কেন? কোন বিষয়গুলো আমাদের  শিহরিত ও রোমাঞ্চিত করে এবং কেন? কখনো কি ভেবে দেখেছি আমাদের সময়কে কীভাবে ব্যবহার করছি এবং  তার পিছনে মূল প্রেরণা কি? যদি তা না করে থাকি তাহলে এ বিষয়ে আমাদের ভাবনার অনেক কিছু আছে। এগুলো এমন কিছু প্রশ্ন যেসবের উত্তর আমাদের সবারই নিজেকে সচেতনভাবে করা এবং সততার সাথে এর উত্তর  জানা উচিত। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বা বের করতে আমাদের অনেক দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে, অনেক দীর্ঘ সময় ধরে অনেক মেহনত করতে হতে পারে।

যাইহোক, সব মিলিয়ে নিজেকে চেনা বা জানার কাজটা কঠিন। এর কারণ হলো আমরা প্রতিদিন যেসব কাজ করি সেগুলোর অনেকটাই অভ্যাসবশত করি। প্রতিটি কাজ আমরা জেনে-বুঝে চিন্তা-ভাবনা করে সম্পাদন করি না। এর কারণ হলো, আমাদের প্রতিটি কাজ-কর্ম ও আচার-আচরণের বিষয়ে সতর্ক থাকতে গেলে আমাদের মন-মগজকে সদাসচেতন থাকতে হয়। এর বিপরীতে যদি আমরা ভালো মতো চিন্তা-ভাবনা না করে গড্ডালিকা প্রবাহে গাঁ ভাসিয়ে দিতে পারি তাহলে বিষয়টিকে সহজ বলে মনে হয়, মন-মগজের ওপর চাপও কম পড়ে। আমরা বেশিরভাগ মানুষই জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় এভাবেই কাটিয়ে দেই। আমাদের মধ্যে আরেকটি প্রবণতা হলো, আমরা নির্ঝঞ্ছাট থেকে আনন্দ উপভোগ করতে চাই। কোনো কিছুকে অপছন্দীয় ও জটিল বলে মনে হলেই আমরা এর ভালো দিকগুলোর দিকে না তাকিয়েই তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমরা সহজে কোনো কিছুর গভীরে যেতে চাই না।

আসলে আমাদের অবচেতন মনে আমাদের নিজস্ব কিছু প্রত্যাশা, আবেগ ও অনুভূতি মজুদ থাকে যেগুলো আমাদেরকে কোনো কিছুর বিষয়ে গভীর চিন্তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যদি খুব গভীরভাবে চিন্তা করি তাহলো হয়তো দেখতে পাবো আমরা যে পেশায় আছি অথবা আমরা যে সম্পর্ক বজায় রেখে চলছি তা আমাদের নিজেদেরকে একেবারেই ভুলিয়ে। এমনকি আমাদের চারিপাশের পরিবেশ আমাদেরকে যে ফালতু বিষয়ে ডুবিয়ে রেখেছে যা আমাদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অবমাননাকর। আমাদের মন-মগজ বিশেষকরে অবচেতন মন এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না। এ কারণেই আমরা নিজেদেরকে বেশিমাত্রায় চিনতে বা জানতে আগ্রহী নই। মনো বিশারদদের মতে, এ ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় অর্জিত আমাদের কলুষিত ও অবচেতন মনের কারসাজিই সবচেয়ে বেশি। আমাদের বখে যাওয়া মনোজগতে নিজেকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে দিতে চায় না। কারণ আমরা শৈশব থেকে গভীরভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত নই, নিজেকে জানার চেষ্টা আমাদের মধ্যে ছিল না।

আমাদের অবচেতন মন আমাদের অতীতের সকল অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, জ্ঞান, আবেগ, বিশ্বাস ও দক্ষতাকে ধারণ করে রেখেছে। আমরা অতীতে যা যা করেছি, ভেবেছি বা অর্জন করেছি, সেই সকল তথ্যই মজুদ থাকে অবচেতন মনের কাছে। তাই যদি দেখা যায় যে, আমরা নতুন এমন কিছু করতে যাচ্ছি যা একেবারেই নতুন  এবং আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক, তখনই বেঁকে বসে আমাদের অবচেতন মন। আমরা ইতিমধ্যেই কোনো নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী হলে সহজে যেমন নতুন কোনো আদর্শকে গ্রহণ করতে পারি না, অবচেতন মনও তেমনই তার নিজস্ব আদর্শ হতে বিচ্যুত হতে চায় না। ফলে আমরা খুব সচেতনভাবে কোনো নতুন ধরনের কাজ করতে চাইলেও, অবচেতন মন আমাদের টেনে ধরে রাখে।

যেহেতু অবচেতন মনেই অবস্থান করে আমাদের আবেগ, তাই অবচেতন মন চাইলে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে আমাদের আচার-ব্যবহার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকেও। একবার যদি আমরা কোনো কাজের বিরুদ্ধে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি, তখন আবেগকে চাপা দিয়ে ওই কাজ অব্যহত রাখা হয়ে পড়ে অসম্ভব। যদি আমরা কোনো কাজ করার পেছনে সচেতনভাবে একটি যুক্তি সাজাতে চাই, দেখা যায় ওই সময়ের মধ্যে আমাদের অবচেতন মন সাজিয়ে ফেলেছে বিপক্ষ অবস্থানের দশটি যুক্তি। এভাবে অবচেতন মন আমাদের যুক্তি-বুদ্ধি, আবেগ, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, মেজাজ সবকিছুতেই কলকাঠি নাড়তে পারে। ফলে তার কাছে প্রায়ই হার মানতে বাধ্য হয় আমাদের সচেতন মন।

নিজেকে চেনা বা জানার জন্য অবচেতন মনের পিছুটানকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অবচেতন মনের বিভিন্ন নেতিবাচক আবেগের কারণে আমরা নিজেদেরকে চেনা বা জানার পদক্ষেপ নিতে হয়তো ভয় পাচ্ছি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে আমাদের  সচেতন মনের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে অবচেতন মন বেশি শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হচ্ছে, যার ফলে আমাদের ইচ্ছাটি অবদমিতই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু যদি আমাদের ইচ্ছাশক্তির মাত্রা অনেক বেশি থাকে এবং আমাদের  মানসিকতা গভীরভাবে মহান রবের সাথে সম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত থাকে, তাহলে অবচেতন মনের নেতিবাচক আবেগ আমাদেরকে কোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। 

নবীদের মৌলিক কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো মানুষের অবচেতন মন যেন আল্লাহ্ র ইচ্ছার অনুগত হয়। এটা তখনই সম্ভব যত বেশি আমরা নিজেকে বিশ্লেষিত করব এবং আবিষ্কার করার চেষ্ট অব্যাহত থাকবে । আল্লাহ্ আমাদের সবাইকেই বুঝার ও আমল করার তৌফিক নসিব করুন । আমিন।

Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

আলেয়ার আলোই আলোকিত এ ভূবন


আল্লাহ্ শুধু আমাদের স্রষ্টাই নয় বরং তিনি আমাদের প্রত্যেক অনুভব-অনুভূতির মালিক। কোনকিছুর প্রতি ভাল-মন্দ অথবা সম্মান-অসম্মান এই রুচিবোধ আল্লাহ্ তায়ালা মানুষের ফিতরতের মধ্যে দিয়ে রেখেছেন। ফিতরতের এই গুণাবলী সঠিকভাবে লালন করে আরও উৎকর্ষ করার মাঝেই মানুষের চির সাফল্য নিহিত। আল্লাহতায়ালার দুনিয়াতে নবীদের পাঠানোর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের ফিতরতের এই গুণাবলীকে আবাদ করে আল্লাহর সত্যিকারের প্রতিনিধি হওয়া। আল্লাহর কাছে সত্যিকার বান্দা হওয়ার সর্বপ্রধান শর্ত হলো অন্তরের শুদ্ধ অনুভূতি ও মাপ। আর অন্তর হলো শুদ্ধ রুচিবোধ ধারণ করার পাত্র।

মানুষের  অধঃপতন বলতে মূলত বোঝায় তার অন্তরের রুচিবোধ নষ্ট বা বিকৃত হওয়া। আর জাহিলিয়াত বলতে বোঝায় ভুলকে শুদ্ধ, ভালকে মন্দ, সম্মানকে অসম্মান, সত্যকে মিথ্যা মনে হওয়া। মানুষের জাহিলিয়াতের উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অন্যতম হলো ভুল জিনিষের মধ্যে সম্মান খোঁজা। অর্থাৎ যে জিনিষ সম্মানের নয় সেই জিনিষ অর্জন করতে পারাকে গৌরবের মনে করা। আল্লাহতালা মানুষকে সম্মানিত করেই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহতালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন - 

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا

নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।

আল্লাহতালা সম্মানিত বনী আদমকে সীমাহীন সম্মান দেওয়ার জন্য বার্তা এবং বার্তাবাহকে সাথে দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষার নিমিত্তে কে কত শুদ্ধ রুচি বা ইচ্ছা নিয়ে তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। নবীরা কিতাবের মাধ্যমে মানুষকে শুদ্ধ নীতি-নৈতিকতা, সম্মান-অসম্মান, উপলক্ষ্য-লক্ষ্য'র সঠিক মাপকাঠি শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্ত বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় আমরা-প্রচলিত দূষিত সমাজ- অলিক, মনগড়া, ভিত্তিহীন এবং অসৎ রীতিনীতিকে আমাদের নীতি-নৈতিকতা, সম্মান-অসম্মান, উপলক্ষ্য-লক্ষ্যকে সঠিক মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছি এমনকি এগুলোকে উপাস্য জ্ঞান করছি।  কেননা আমাদের সমস্ত হাসি-কান্না,ভালোলাগা-ভালবাসা, সুখ-দুঃখ এগুলোর সাথে জড়িত।

আমরা পাশ্চাত্য সভ্যতা দ্বারা এত বেশি প্রভাবিত যে আমাদের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক মুনাফা। সমাজে সম্মান পেশা দ্বারা নির্ধারিত হয় কারণ পেশা দ্বারা ভোগ ও ক্ষমতার মাত্রা নির্ণয় করা যায়। যে পেশা দ্বারা বেশি ক্ষমতা চর্চা ও ভোগ বেশি করা যায় সেই পেশা সমাজে তত বেশি আদৃত ও সম্মানিত। কিন্তু সমাজের সম্মান কখনো পেশা দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না।বরং মানব সমাজের সম্মান নির্ধারিত হবে মানবিক গুণাবলীর অসীম সৌন্দর্যে। মানুষের সম্মান মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যে অর্থ্যাৎ  কে কত বেশি সততা , বিনম্রতা, দয়া-ভালবাসা, আত্মত্যাগ, পরার্থপরতা, কৃতজ্ঞতা, উদারতা ও মহানুভাবতা ইত্যাদি মানবিক সৌন্দর্য দিয়ে নিজের জীবনকে সাজাতে পারে সেটাই ছিলো প্রকৃতই সম্মান। পেশা যদি সম্মানের মাপকাঠি হতো তাহলে মহামানবরা বিশেষকরে নবীরা সবচেয়ে অসম্মানীয় ছিলেম (নিউজুবিল্লাহ)। কেননা তাঁরা বেশিরভাগ ছিলেম আমাদের সমাজের নিকৃষ্ট পেশা রাখাল আথবা আমাদের পরিভাষায় ফেরিওয়ালা ব্যবসায়ী। কিন্ত বড় আফসোসের বিষয় আজকের জাহেলী সমাজ ঐ পেশাগুলোকেই সম্মানের রাজটীকা পরিয়েছে যেগুলি দ্বারা কল্যাণের নয় বরং সবচেয়ে বেশি জুলুমকে করা যায়, অন্যকে নিজের হীন অধীনস্থ বানানো যায়, অন্যকে হেয়ো করা যায়, নিজের ফাঁকা দম্ভ ও অহংকারকে চরিতার্থ করা যায় এবং দূর্বলদের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে চাটুকারিতার অমোঘ অমৃত আস্বাদন করা যায়।

তারপরও পেশাকে যদি আমরা সম্মানজনক হিসাবে দেখি তাহলে এক্ষেত্রে প্রথমত বিবেচ্য ছিল এটা কতটা হালাল'। তারপর পেশাটা কতখানি কল্যাণপূর্ণ, সেবাধর্মী এবং আত্মশিক্ষামূলক।আমরা পেশাকে যদি সম্মান দিতেই চাই ঐসকল পেশা সর্বাধিক সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত যে পেশার দ্বারা যত বেশি কল্যাণমূলক ও মানবিক গুণাবলী ফুটিয়ে তোলা যায়। 

এরচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় যাঁরা সত্যিকার কল্যাণপূর্ণ এবং নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেন, অর্থ্যাৎ যাঁরা মহান শিক্ষাকতা পেশার সাথে জড়িত তাঁরা নিজেরাই নিজেদের কাছে বড় বেশি আত্মমর্যাদাহীন।বরং তাদের কাছে তারাই বেশি সম্মানী যারা শুদ্ধ জীবনবোধ ও নীতি-নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজে অস্বাভাবিকভাবে  ফুলে ফেঁপে উঠেছে এবং জুলুমের চাবুক বড় নিষ্ঠুরভাবে চালাচ্ছে। শুধু এখানেই শেষ! না বরং তাদের মত হওয়াকে জীবনের স্বার্থকতা মনে করছে।পানিপান যদি পিপাসা অধিক বৃদ্ধি করে, তাহলে এ সে জাতির ভাগ্যে অমানিশা ছাড়া কিছুই জুটতে পারে না। 

এই আসমান এবং জমিনের সম্মান এবং প্রতিপত্তির একমাত্র মালিক আল্লাহতালা। আর মানুষ সৃষ্টিকর্তার বড় দূর্বল সৃষ্টি কিন্ত দুর্বলতা তখনই সৌন্দর্য এবং সম্মানে রূপ নিবে যখন এই দূর্বল মানবজাতির প্রত্যেক কর্মোদ্দীপনায় মহান আল্লাহতালাই হবে  একমাত্র উদ্দীপক।  এ কথাই আল্লাহ্ তাঁর পাক কালামে জানিয়েছেন এভাবে --

 وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَٰكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ

সম্মানতো শুধু আল্লাহ তাঁর রসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। 63-Al-Munafiqun : 8

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক 


Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

ইডেন ও আমাদের কাপুরুষতা


একটি সমাজের পচন কতো কত গভীর হলে যেখানে মাববতা, সহনশীলতা ও বিবেকবোধ প্রস্ফুটিত হওয়ায় কথা সেখানে জন্ম নেয় এমন এক সুশৃঙ্খলা গ্যাং যাদের কাছে  আদিম বর্বরতাও নস্যি। শুধু তাই নয় এদের শিকড় সমাজের মূলে প্রোথিত এবং সমাজের মুখপাত্র।  আমরা  কোনোদিনই  এই আলো নামক ফোয়ারা থেকে আলো পাব না যতদিন না কৃষ্ণছায়াকে  আবিষ্কার করতে না পারি এবং এর মোকাবিলায় নতুন সূর্য হাজির করতে না পারি। আমরা যে ভোগবাদী শিক্ষা ও জীবন দর্শনকে জীবনের ব্রত  বানিয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের এই করুণ অর্জন। আমরা যত বেশি এই পাশ্চাত্য হাদারাহ কে আপন করব তত বেশি আমরা অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে পড়ব এবং নিজেদের হারাতে থাকব। এমনকি সত্য, সুন্দর ও আলোর আকাঙ্খা ঘৃণায় পর্যবসিত হবে এবং  এমন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠবে যারা সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের মোকাবিলায় দাড়িয়ে সমস্ত অব্যবস্থাপনা, অশালীনতা, অনিয়ম, অন্যায় ও অবিচারের ঝান্ডাবাহী হবে।বর্তমানে শিক্ষা নামে যা কিছুর সাথে  আমরা পরিচিত তার সবটুকুই নিজেকে স্বার্থপর, কাপুরুষ, হীন ও আত্মমর্যাদাহীন হয়ে ভোগবাদী সমাজের অধিপতি অথবা নিকৃষ্ট দাস হয়ে জীবন যাপন করা। 

যে শিক্ষালয়  আমাদের আলোকিত করবে সেখানে ঘটে চলেছে আদিম বর্বরতা। এর দায় কার? এর দায় আমাদের সবার বিশেষ করে যারা আমরা নিজেদেরকে তথাকথিত শিক্ষিত মনে করি। সব বর্বরতার নেতৃত্বেতো আমরা এই শিক্ষিতরাই। স্বাধীনতা উত্তর এই লেজুড় ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি, হত্যা, জুলুম, নির্যাতন, ব্যভিচার ও পরাধীন পতিতাবৃত্তি, শ্রেণীবৈষম্য  ও নীতিহীন রাজনীতির জড় ক্রীড়ানক হওয়া ছাড়া  কি অবদান রেখে চলেছে! আবার যারা নম্র ভদ্র লেজ বিশিষ্ট  তাদের কাজ সব বর্বরতা, অন্যায় ও অনাচার  হাস্যবদনে মেনে নেওয়া  এবং সাথে সাথে আমাদের কিউট নারীবাদী ও অধোগতিশীলরা মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় কখন ও কীভাবে ইসলাম নিকুচি করা যায়। 

আমাদের দেশ  কীভাবে টিকে আছে সেটা বলার জন্য এক বিস্তর গবেষণা করার প্রয়োজন। তবে আমাদের শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য ও মানব সমাজের সুষ্ঠু সংস্কৃতি বিকাশ ও বিপ্লব  ঘটাতে না পারলে এ জাতির ভবিষ্যত কালো মেঘে ঢাকা। তবে তৎপূর্বে আমাদের ফিরে আসতে হবে পাশ্চাত্য সভ্যতা বা হাদারাহ র হেমলক পান করা থেকে।আমাদের নিজস্ব ভাবনা,দর্শন ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে ও আমাদের  মূল্যবোধ ঐ পরিমাণ উন্নত করতে হবে যেন কোন যুবতী মেয়ে হীরা থেকে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত একাকী সফর করলেও তাঁর দিকে কেউ খারাপ নজরে না তাকাই। একজন বিধর্মী তার যুবতী কন্যাকে নিঃসংকোচে কোন মুসলিম ঘরে রেখে আসতে পারে। কোথায়  হারিয়ে গেল! আমার ম -বোন জাতির প্রতি সম্মানও দায়িত্ববোধ। আমারা কেমন করে আমার মায়ের জাতিকে এত নিকৃষ্ট পণ্যে পরিণত করলাম। হে জমিন! তোমার গর্ভ উন্মোচন কর - আমাকে গ্রাস কর!!

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক 
Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

পাশ্চাত্য সভ্যতা ও আমরা


 হজরত মুশফিক আহমদ রহঃ বলতেন , "একটা হলো আমি আরেকটা হলো আমার। বর্তমান সভ্যতার সব মেহনত ও শিক্ষা  আমার জিনিসকে কেন্দ্র করে অর্থ্যাৎ আমার জীবন যাপনের বস্তুগত জিনিসকে কেন্দ্র করে।" আমি বা আমরা বলতে যা বুঝায় সেটাই সম্ভবত হাদারাহ(সভ্যতা) আর আমি বা আমরা থেকে বস্তুগত যে সৃষ্টি সেটাই হলো মাদানিয়্যাহ(বস্তুগত অগ্রসরমানতা)।জ্ঞানের জগতে দুটি ডিসকোর্স  আছে, একটি- হাদারাহ( সভ্যতা)ও অন্যটি মাদানিয়্যাহ (বস্তুগত অগ্রসরমানতা)। আমি বা আমরা বলতে যা বুঝায় সেটাই হাদারাহ। আর আমি বা আমরা যে বস্তুগত উপজীব্য সৃষ্টি করি সেটাই হলো মাদানিয়্যাহ(বস্তুগত অগ্রসরমানতা)। হাদারাহ বলতে জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণাকে বোঝায় যা অনেক বেশি নির্দিষ্ট এবং তা জীবন দর্শনের উপর নির্ভর করে। অন্যদিকে মাদানিয়্যাহ বলতে জীবন যাপনের উপকরণের বস্তুগত অবস্থা কে বোঝায় এবং এটি সুনির্দিষ্ট হতে পারে কিংবা সার্বজনীন হতে পারে। সুতারং হাদারাহ হতে উদ্ভূত বস্তুসমূহ অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও সমাজের আইকনিক হয়। আবার বিজ্ঞান ও তার অগ্রযাত্রা, শিল্প ও তার বিবর্তন ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ অনেকবেশী সার্বজনীন এবং তা কোন নির্দিষ্ট জাতির জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং তারা অনেক বেশি সার্বজনীন, যেমন শিল্প,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ।

মাদানিয়্যাহ (বস্তুগত অগ্রসরমানতা) আমাদের কাছে দুইভাবে হাজির হয়। এক. হাদারাহ থেকে উদ্ভূত হয়, দুই. বিজ্ঞান ও শিল্পের অগ্রযাত্রা থেকে উদ্ভূত হয়। বিজ্ঞান ও শিল্পের অগ্রযাত্রা শুরু হয় মুসলমানদের হাত ধরে যদিও বর্তমানে শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নাটাই পশ্চিমাদের হাতে। পশ্চিমা এই শিল্প,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  হতে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ থেকে উপকারী জিনিস গ্রহণে তেমন কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু পশ্চিমা হাদারাহ (সভ্যতা) থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ সর্বক্ষেত্রে অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কারণ পশ্চিমা হাদারাহ-র  মৌলিক ভিত্তি ও চালিকা হলো হেডোনিজম। এছাড়া এর সামগ্রিক দর্শন ও লক্ষ্য ইসলামি হাদারাহ এর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। পাশ্চাত্য হাদারাহ প্রতিষ্ঠার মৌলিক নিয়ামক ছিলো জীবন থেকে দ্বীনকে তথা ধর্মকে ছুটি দেওয়া। অর্থ্যাৎ জীবনের সব পর্যায় তথা - ব্যক্তিগত, সামাজিক ও বৈশ্বিক  সব ক্ষেত্র থেকে দ্বীন বা দ্বীনের ভূমিকাকে অস্বীকার করা। সমাজ ও রাষ্ট্রের সব জায়গা থেকে দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র মসজিদ বা গির্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যা শুধু সমাজের অলঙ্কার হিসাবে শোভা পাবে কিন্তু সমাজের ড্রাইভিং প্যারাডাইম হিসাবে থাকতে পারবে না। 

এই হাদারাহ'র একমাত্র উদ্দেশ্য মুনাফা। মুনাফার অন্বেষণ করাই হচ্ছে সমগ্র জীবনের মূল উদ্দেশ্য। এই হাদারাহতে লাভ বা মুনাফাই হচ্ছে একমাত্র প্রভাবক। কাজেই পাশ্চাত্য জীবন পরিচালনার মূল মাপকাঠি হচ্ছে মুনাফা। কারণ তারা জীবনকে মুনাফা হিসাবে চিত্রিত করেছে। তাদের দৃষ্টিতে সুখ (happiness) হচ্ছে মানুষকে সর্বোচ্চ ঈন্দ্রিয়গত সুখ প্রদান এবং এ লক্ষ্যে মানুষকে প্রয়োজনীয় উপকরণে তারা সজ্জিত করে। পশ্চিমা হাদারাহতে মুনাফা অর্জনের তীব্র আকংখাই মূল উপজীব্য বিষয় এবং মুনাফা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ের উপরই তারা মনোযোগ দিতে আগ্রহী নয় এমনকি অন্য কোন বিষয়কে তারা স্বীকৃতি দিতেও প্রস্তুত নয়। ফলে এর উপর ভিত্তি করেই সকল কাজ নির্ধারিত হয়।এমনকি এই সভ্যতা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক কার্যাবলি গুলোও  বিকৃত করে ইন্দ্রিয়গত ভোগের মাধ্যম বানিয়েছে। অর্থ্যাৎ পাশ্চাত্য সভ্যতার একমাত্র নিয়ন্ত্রক ভোগবাদ যা তাদের আচার-ব্যবহার, মূল্যবোধ ও সততা এমনকি তাদের আধ্যাত্মিকতাওকে পরিপূর্ণ গ্রাস করে ফেলেছে।

অন্যদিকে  ইসলামি  সভ্যতার একমাত্র লক্ষ্য শুধু আল্লাহ্ র সন্তুষ্টি যা পাশ্চাত্য সভ্যতার একেবারেই বিপরীত। আল্লাহ্তাআলা তাঁর পাক জবানে মানুষের তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন- এক. ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ্ র,দুই. পৃথিবীকে পরিচালনা করা তথা প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে পরিচালনা করা, তিন. পৃথিবীকে আবাদ করা ইবাদাতের উপযোগী করে। ইসলামি সভ্যতা অবশ্যই অবশ্যই বস্তুগত ও অবস্তুগত  উভয় অগ্রসরতার নেতৃত্ব দিবে এবং  পৃথিবীকে একটি মানবিক সুশৃঙ্খলায় জুড়ে রাখবে  কিন্তু এ সমস্ত কর্মযজ্ঞ ও প্রতিবিধানের একমাত্র  উদ্দেশ্য ও চালিকা হবে আল্লাহ্ র সন্তুষ্টি । অর্থ্যাৎ দুনিয়াকে আবাদ করা ও  পরিচালনা করার মৌলিক দর্শন শুধুমাত্র আল্লাহ্ র সন্তুষ্টি। 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত মাদানিয়্যাহ বস্তু যেমন, গবেষণাগারের উপকরণ (ল্যবোরেটরী ইক্যূইপমেন্ট), চিকিৎসা ও শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, গালিচা (কার্পেট), ইত্যাদি সার্বজনীন মাদানিয়্যাহ'র অন্তর্গত। এরূপ বস্তু সমূহ যা হাদারাহ থেকে উদ্ভূত নয়, কিংবা হাদারাহ'র সাথে সম্পর্কিত নয়, তা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব নিয়ন্ত্রনকারী পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি এক পলক দৃষ্টি দিলেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে তা মানুষকে শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। বরং পশ্চিমা সভ্যতাই বর্তমান মানুষের জীবনের গভীরে প্রোথিত দুর্দশা ও ভোগান্তির মূল কারণ। এই হাদারাহ, যা'র মূলে মানব জীবনের বিষয়গুলো থেকে দ্বীন কে পৃথক করা হয়েছে তা মানুষের ফিতরাহ'র পরিপন্থী। এবং এ সমাজে মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর কোন মূল্য নেই। উপরন্তু জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী হিসাবে মুনাফা এবং মুনাফা অর্জনই মানুষের মধ্যবর্তী সম্পর্কগুলোর মূল ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হয়। ফলত: অবধারিত ভাবে এটি চিরস্থায়ী দুর্ভোগ ও অশান্তি ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনা। যতক্ষণ পর্যন্ত মুনাফা হচ্ছে মূলভিত্তি, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই এতে সংঘর্ষ এবং মানুষের মাঝে সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠা করতে শক্তি প্রয়োগের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ হাদারাহ'র অনুসারীদের জন্য উপনিবেশবাদ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কারণ এখানে মুনাফাই জীবনের মূল ভিত্তি এবং নৈতিকতার কোন তোয়াক্কা করা হয়না। কাজেই, স্বাভাবিক ভাবেই আধ্যাত্মিকতার মূল্যবোধ যেমন উপেক্ষিত হয় ঠিক তেমনি অন্য যে কোন ভালো নৈতিকতার বিকাশও রুদ্ধ হয়ে যায় এবং জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম, আগ্রাসন ও উপনিবেশের উপর। বর্তমান বিশ্বে মানুষের মাঝে আধ্যাত্মিকতার সঙ্কট, চিরস্থায়ী উদ্বেগ, সর্বত্র মন্দের ব্যপক বিস্তৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যা স্পষ্টতই পশ্চিমা হাদারাহ'র ফলাফল। এটি সমগ্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর মাধ্যমে এরূপ ভয়াবহ পরিণতির দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে, এবং ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানবতার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলেছে, দুনিয়াকে পরিণত করেছে কান্নার উপত্যকায়।

ইসলামী হাদারাহ যা ৭ম শতাব্দী থেকে ১৮শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, তার একটি তথ্যচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এতে কখনোই উপনিবেশবাদী নীতি ছিলনা। অবশ্যই উপনিবেশবাদ ধারণাটি ইসলামী প্রকৃতি বিরোধী। তাই ইসলামের প্রকৃতি বা আকীদা জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়, যা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয় আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সীমারেখার মাধ্যমে। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই সুখ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। 

পরিশেষে, সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো আজ মুসলিম উম্মাহ  শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাদানিয়্যাহ গ্রহন করার চেয়ে পাশ্চাত্য হাদারাহ কে বেশি আপন করে নিয়েছে। মুসলিম উম্মাহ পাশ্চাত্যের এই হেমলকে বুঁদ হয়ে ইসলামের সুমহান জীবনবোধ ও দর্শনকে পায়ে ঠেলে কাপুরুষতা, আত্মমর্যাদাহীনতা ও জিল্লতীর  গ্লানি বয়ে চলেছে। যারা পৃথিবীকে যমযমে তৃপ্ত করবে তারাই পাশ্চাত্য হাদারাহ র হেমলক পান করে নীল হয়ে আছে। জগতের পাঞ্জেরি যখন পথ হারিয়ে ফেলে তখন ব্ল্যাকহোল ছাড়া কি গন্তব্য থাকে!! হে জগতে সংসারের মালিক!  ফিরিয়ে দাও সুমতি, কেড়ে নাও অমানিশা। আমরা যে আছি বড় ঘুটঘুটে অন্ধকারে!!!

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক
Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

ইসলামে ভ্রাতৃত্ববোধ


ইসলামে ভ্রাতৃত্ববোধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আর এ ভ্রাতৃত্বের মানদন্ড ঈমান। ভ্রাতৃত্বে বহুবিধ ফায়দা নিহিত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফায়দা হলো এটা আমাদেরকে  আত্মপ্রেম বা আত্মপূজা থেকে উদ্ধার করে। আমরা যত বেশি আল্লাহ্ র জন্য মুসলিমদের বা সমস্ত সৃষ্টিকে ভালবাসব তত বেশি নিজেদের পরিচয়ের পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হতে পারব। এছাড়া শেষ নবির উম্মাহ হিসাবে আমাদের উপর ন্যস্ত দাওয়াতের কাজ যথাযথ সিফত, কর্তব্যের ও অনুভূতির সাথে করতে পারব ইনশাআল্লাহ। তখন আমাদের ইবাদাত ও দাওয়াত পূর্ণতার দিকে ধাবিত হবে। মহান রাব্বুল আগামী মুমিনদের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন-  Al-Hujurat ৪৯:১০

اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ اِخْوَةٌ    

নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। 

আবার,  রাসূল -সাল্লালাাহু আলাইহি ওযাাসাল্লাম- ইরশাদ করেন: “সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে ম’মিনদের দৃষ্টান্ত এক‌ই দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর জ্বর ও অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়”(সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

রাসূল -সাল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- অন্যত্র বলেন: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“একজন মু’মিন অপর মু’মিনের জন্য আয়না স্বরূপ, মুমিন পরস্পর ভাই ভাই। সে তার জমি সংরক্ষণ করে এবং তার অনুপস্থিতিতে তা হেফাযত করে”(জামে’উত তিরমিজি)। মু’মিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তারা যেন সুদৃঢ় প্রাচীরের মত”(সূরা সাফ্ফ: ৪)। তাই মু’মিনদের মধ্যকার পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সকলের জন্য অনিবার্য।

হযরত মুশফিক আহমদ রহঃ বলতেন- দীন দুই জিনিসের সমষ্টি; এক ইবাদাত, দুই দাওয়াত। ইবাদাতের প্রাণ আল্লাহ্ র ভালবাসা  আর দাওয়াতের প্রাণ মানুষের প্রতি ভালবাসা। এক সাহাবী এসে রাসুলুল্লাহর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ দীন কী? উত্তরে আল্লাহ্ র রাসুল বললেন- দীন হলো হিতকামনা। সুতারং একজন মুসলিম অপর মুসমি ভাইয়ের জন্য সর্বদা কল্যাণকামী ও সহযোগিতার মানসিকতা সম্পন্ন হবে। আর এ সম্প্রীতি ও সহযোগিতার সীমারেখা তাকওয়া এবং কল্যাণের পথে, ন্যায় ও বৈধ কাজে। 

কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে: “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়াার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে সহযোগিতা করবে না”(সূরা মায়েদা:০২)। ন্যায় ও কল্যাণের বিষয়ে নিজ কওমকে সাহায্য করা অন্যায় সম্প্রদায়প্রীতি নয়; বরং ঈমানের দাবী। আর জুলুম ও অন্যায় কাজে নিজ ক‌ওমের অন্ধ পক্ষপাতিত্ব করাই নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িকতা। রাসূল-সাল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আসাবিয়াত’ তথা সাম্প্রদায়িকতা কী? তিনি উত্তরে বলেন, আসাবিয়াত হল নিজ সম্প্রদায়কে তার অন্যায়-অবিচারে সাহায্য করা (সুনানে আবু দাউদ)। তাই অন্যায়ের ক্ষেত্রে অন্ধ পক্ষপাতই সাম্প্রদায়িকতা, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসের ভাষায়: “যে ব্যক্তি আসাবিয়াতের দিকে ডাকে বা আসাবিয়াতের কারণে যুদ্ধ করে বা আসাবিয়াতের ওপর মৃত্যুবরণ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়”(সুনানে আবু দাউদ)। অতএব ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হল, তাকওয়া ও কল্যাণের কাজে এবং ন্যায় ও ইনসাফের পথে মুসলমানগণ পরস্পরকে সমর্থন ও সহযোগিতা করবে। নিজেদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখবে, তবে যেকোনো অন্যায়ের পক্ষাবলম্বন ও সহযোগিতা হতে নিজকে বিরত রাখবে। রাসূল (সা.) এর বাণী: হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“তোমার ভাইকে অত্যাচারী ও অত্যাচারীত অবস্থায় সাহায্য কর। তখন জনৈক সাহাবী (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে রাসূল (সা.) তাকে অত্যাচারীত অবস্থায় আমি সাহায্য করব; কিন্তু অত্যাচারী হলে কিভাবে সাহায্য করব? জবাবে রাসূল (সা.) বলেন, তুমি তাকে অত্যাচার করা হতে বিরত রাখবে। আর এটাই তাকে সাহায্য করা” (সহীহুল বুখারী)।

ন্যায় ও কল্যাণের কাজে একজন মু’মিন অপর মু’মিন ভাইয়ের জন্য স্বীয় স্বার্থ বিসর্জনেও উৎসাহিত করে। ইসলামের সূচনালগ্নে মক্কার মুসলিমগণ যখন কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন,আপন গোত্রের অবিচার ও নিপীড়নে নিজেদের জন্মস্থান ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন মদীনার মুসলমানগণ সহযোগিতা ও সহানুভূতির এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যার দ্বিতীয় নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা নিজেদের প্রয়োাজন ও দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও সহায়-সম্বল এবং আপনজন বিহীন মুহাজির মুসলিমগণের জন্য ধন সম্পদ ও আপন স্বার্থ ত্যাগের সমুজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের এ গুণ পছন্দ করে আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন: ٌ“আর তারা (আনসার) তাদেরকে (মুহাজির) নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও” (সূরা হাশর:০ ৯)। আল্লাহ তা’আলা জান্নাতের বিশেষ কিছু নি’আমত উল্লেখপূর্বক এসকল নে’আমতের অধিকারীগণের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন: “খাবারের প্রতি আসক্তি (প্রয়োজন) থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম, ও বন্ধীদের খাবার দান করে” (সূরা দাহর: ৮-৯)।

ইসলামী ভ্রাতৃত্বের গন্ডি কোন স্থান, কাল, ভাষা, গোত্র বা বর্ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গোটা বিশ্বের সকল স্থানের মুসলমানগণই পরস্পর ভাই ভাই। আর তাই একজন মু’মিন হিসেবে অপর মু’মিন ভাইয়ের জন্য নিজ দেশে যেমনি কর্তব্য রয়েছে,তেমনি দেশ,জাতি, ভাষা, গোত্র ও বর্ণের সীমানার বাহিরেও কিছু করণীয় রয়েছে। নিম্নে মুসলিমগণের পারস্পরিক কিছু মৌলিক গুণাবলী ও করণীয়  উল্লেখ করা হলো-

আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে একজন মু’মিন অপর মু’মিনকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসবে যতটা একজন মুমিন নিজেকে যেমন ভালবাসে। পরিচিত/ অপরিচিত সকলে মধ্যে সালাম ও মেহমানদারির অনেক প্রসার ঘটানো। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমাদেরকে যখন অভিবাদন করা হয় তখন তোমরাও উহা অপেক্ষা উত্তম অভিবাদন করবে বা উহারই অনুরূপ করবে”(সূরা নিসা:৮৬)। রাসূল (সা.) বলেন: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত. তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনয়ন করবে, আর ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনয়ন করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কী তোমাদেরকে এমন বিষয়ে বলে দেবনা যা সম্পাদন করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে? আর তাহলো তোমরা নিজেদের মাঝে সালাম বিনিময় কর” (সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণা ও গীবত হতে পুরোপুরি বিরত থাকা। কুরআনুল কারীমের ভাষায়: “হে মু’মিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে বেঁচে থাক; কেননা অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ। এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং অপরের পশ্চাতে গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কী তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তা ঘৃণা কর”(সূরা হুজুরাত: ১২)।

ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় পারস্পরিক গালি-গালাজ ও ঝগড়া-বিবাদ হতে বিরত থাকা কারণ এটা মুমিনের শানের খেলাপ যে কোন ব্যক্তিগত কারণে অপর ভাইয়ের সাথে খারাপ আচরণ করা। হাদীসের ভাষায়: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: মুসলিমদের পারস্পরিক গালি দেয়া ফাসেকী এবং হত্যা করা কুফুরী”(সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্বের একটি দিক হলো- প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পরস্পরকে সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়ানো এবং সামর্থানুযায়ী সাহায্য ও সহযোগিতা করা; আল্লাহ তা’আলার ভাষায়: “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়াার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করবে”(সূরা মায়েদা: ০২)।

ভ্রাতৃত্বের আরেকটি দাবি হলো ছোট-খাটো মতানৈক্যের কারণে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি না করা এবং অতীত ও বর্তমান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক ঐক্য সুসংহত করা।  এমনকি যদি প্রয়োজন হয়- ঐক্য সম্পাদনে স্বীয় পদ-পদবীর মোহ ত্যাগ করে অন্যকে প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতা পোষণ করা। অপর মু’মিনের দু:খ-কষ্ট লাঘবে চেষ্টা করা ও ব্যথায় ব্যথিত হওয়া। রাসূল (সা.) বলেন: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:“যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন মু’মিনের কষ্ট দূর করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কষ্ট দূর করবেন..”(সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিফাত হলো, নিজের জন্য যা পছন্দ অপর মু’মিনের জন্যও তা পছন্দ করা; এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) এর বাণী: হযরত আনাস (রা.) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:“তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার অপর ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ না করে”(সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির বড় নিয়ামক হলো  অপরের জন্য দু’আ করা এবং  পারস্পরিক হাদিয়া বিনিময় করা। রাসূল (সা.) বলেন: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“তোমরা পরস্পর হাদিয়া বিনিময় করবে এতে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা (সুসম্পর্ক) তৈরী হবে”(সহীহুল বুখারী)।

পরিশেষে বলব, ভ্রাতৃত্ববোধ ইসলামে সভ্যতার সবচেয়ে দৃশ্যমান অনিন্দ্য সৌন্দর্য  যেখানে  অন্য সব সভ্যতা করুণভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। এজন্য ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসের এত বেশি জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। তাইতো রাসূল (সা.) বলেন:“মু’মিনগণ যেন একটি প্রাচীর, যার একটি ইট আরেকটিকে শক্তি যোগায়”(সহীহুল বুখারী)। আমরা ভেবে দেখি কী হওয়ার ছিলো!! আর কী চলিতেছে! আল্লাহ্ আমাদের সবাইকেই বুঝার ও আমল করার তৌফিক নসিব করুন । আমিন।

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক
Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love

সময়ের পরিক্রমায় কারবালা আরও প্রাসঙ্গিক


পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। এর চেয়ে বেশি সত্য পৃথিবীর ইতিহাস জালিম ও মজলুমের ইতিহাস। ইতিহাসের আজকের এই দিনে হযরত হোসাইন রাযি.ও যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সেটিই সবচেয়ে সঠিক এবং অনাগত মুসলিম উম্মাহ ও মজলুমের একমাত্র আলোকদীপ্ত প্রদীপ। কারণ, সেটিই ছিল তাঁর করণীয়। তিনি তা না করলে কেয়ামত পর্যন্ত বিচ্যুত শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কোনো দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে থাকতো না। যখন কোনো ভুল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সমাজে অনাচারের ধস নামার অশঙ্কা জেগে উঠে আর ভালোর আহবান ও মন্দের  প্রতিরোধ এবং তাকওয়া-তাহারাত জাগানো ও খোদাভীতি ও ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির পরিবর্তে শুরু হয় ভ্রমণ-শিকার ও আমোদ-প্রমোদের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধির আয়োজন, চলতে থাকে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার  অপব্যবহার তখন আমাদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত থাকা দরকার হয়ে পড়ে যে, এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কোনো বান্দা দাঁড়িয়ে গেছেন, এসবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এবং প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছেন। যদি এমনটি না ঘটতো তাহলে আপনারা  ইসলামের পরবর্তী যুগের ইতিহাসে  দুঃশাসক, জালেম ও ফ্যাসিস্টদের ব্যাপারে কেবল সমর্থন ও নীরবতার নমুনাই দেখতে পেতেন। সবাই শুধু এ পংক্তিরই অনুসরণ করত-

বাতাস যেদিকেই বয়ে যাক

তুমি এই একদিকেই এগিয়ে চল

তাদের মনোভাব থাকত এমন যে, যত দুঃশাসনই প্রতিষ্ঠা হোক আর যত দুরাচরী সরকারই ক্ষমতায় আসুক-আমরা শুধু তাদের আনুগত্য করে যাব। এটাই আমাদের তকদীর। কারণ আমাদের সামনে দুঃশাসনের আনুগত্য না করার ক্ষেত্রে কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কিছু করার মতো অনুসরণীয় কোনো উদাহরণ নেই। তাছাড়া এ আশংকাও থাকতো যে, এতে ইসলামী ঐক্যের ওপর  নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মুসলমানদের সংঘবদ্ধতা পড়ে যাবে ঝুঁকির মুখে। তাই সবাই নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকত।

এজন্যই হযরত হোসাইন রাযি.-এর এই দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে যে, না, এভাবে চলবে না। সবাই চোখবন্ধ আনুগত্য করবে না। বরং কিছু লোকের এমনও হওয়া উচিত যে, এ দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরোয়াহীনভাবে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এরই ফল হল, পরের যুগের মুজাহিদদের ইতিহাস। যদি আপনারা পড়ে দেখেন সে ইতিহাস, অধ্যয়ন করেন তাদের মনস্তত্ব ও মানসিকতা। তাদের সংলাপ ও বক্তব্য তাহলে অবশ্যই অনুভব করবেন বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দেশে যেসব সংস্কারবাদী আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে, যেসব বৈপ্লবিক প্রয়াস উচ্চকিত হয়েছে, সেসব কটিরই পেছনে হযরত হোসাইন রাযি.-এর স্থাপিত দৃষ্টান্ত ভূমিকা রেখেছে। যুগে যুগে মজলুম বা সংস্কারবাদীদের আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহস বাড়িয়ে তোলা আর সংগ্রামের আবেগ ও প্রত্যয় জাগিয়ে তোলার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল হযরত হোসাইন-এর এই দৃষ্টান্ত। 

এই দৃষ্টান্ত  আমাদের এই প্যারাডাইম দেয় যে, এজাতীয় প্রতিরোধ শিশুসুলভ কোনো চাঞ্চল্য নয়, নয় কোনো উত্তেজক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অস্থিরতা। বরং এটি হচ্ছে হোসাইনী সুন্নত। হযরত হোসাইনের আদর্শ-নীতি। এ প্রতিরোধের ধারা তথা এই হোসাইনি আদর্শ আমাদের ধমনীতে প্রবহমান না থাকে তাহলে আমাদের একমাত্র নিয়তি গোলামির জিঞ্জির ও ফ্যাসিস্টদের উদোম নৃত্য। সমাজে ফ্যাসিবাদের জাল তখনই আষ্ঠেপিষ্ঠে ধরে যখন ফ্যাসিস্টদের নেমকাহারি এলিয়েনেটেড সেকুলারিস্ট ও সালাফিরা হোসাইনি আদর্শ ও ঐতিহ্য আমাদের স্মৃতি ও হৃদয় থেকে ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করে। 

আমাদের  সমাজের জন্য অবশ্যই ইমাম হোসেইন বিশেষভাবে একজন  প্রেরণা ও সম্ভাবনার নামও। কারবালা আমাদের ইতিহাসেরই প্যারাডাইম, যেখানে জালেম ও মজলুমের মধ্যে চিরন্তন লড়াই চলমান। 

কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়ঃ

 "একদিকে মাতা ফতেমার বীর দুলাল হোসেনি সেনা, 

আর দিকে যত তখ্ত-বিলাসী লোভী এজিদের সেনা"

আমি মনে প্রাণ বিশ্বাস করি আজও  ইমাম হোসেইনের আদর্শ বুকে ধারণ করতে পারবেন, মজলুম জনগণের সামনে যারা হোসেইনি উত্তরসূরি  হিসাবে হাজির হইতে পারবেন; কোন ফ্যাসিবাদ তাদেরকে পরাজিত করতে পারবেন না। সলিমুল্লাহ খান গতবছর লিখেছিলেন, আমাদের হৃদয়ের একটা টুকরা হইলেন ইমাম হোসেইন। এই টুকরাটা আমাদের অন্তরের থানাটোস, বা ডেথ ড্রাইভ তথা মৃত্যুর প্রেরণা। ইমাম হোসেইন আমাদের জন্যে শাহাদাত ও বিপ্লবের প্রেরণা। এবং মাহদীয় সম্ভাবনার আধারও।"

বর্তমানেও আমরা  একই কারবালার বধ্যভূমির হোসাইনি সেনা । নজরুলের মতে, হোসেনি সেনারা হইল  ইসলামের সিলসিলা বহনকারী। আর এজিদিরা হইল বৈষম্য ও জুলুমের পক্ষের সৈনিক।  আজও যদি আমরা ফ্যাসিস্টদের থেকে  মুক্তি পেতে চায় তাহলে আবার  হোসাইনি চেতনা ধারণ করে পর্বতসম প্রত্যয়ী ঘোষণা দিতে হবে-

"যে পয়গাম এসেছিল হোসাইন ইবনে আলীর কাছে

আমি আনন্দিত, সে ওফাদারির পয়গাম এসেছে এখন আমারও জন্য।"

প্রভাত আলোকচ্ছটা  হয়ে ফুটুক হোসাইনি সুন্নাহ।

Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love