পাশ্চাত্য সভ্যতা ও আমরা


 হজরত মুশফিক আহমদ রহঃ বলতেন , "একটা হলো আমি আরেকটা হলো আমার। বর্তমান সভ্যতার সব মেহনত ও শিক্ষা  আমার জিনিসকে কেন্দ্র করে অর্থ্যাৎ আমার জীবন যাপনের বস্তুগত জিনিসকে কেন্দ্র করে।" আমি বা আমরা বলতে যা বুঝায় সেটাই সম্ভবত হাদারাহ(সভ্যতা) আর আমি বা আমরা থেকে বস্তুগত যে সৃষ্টি সেটাই হলো মাদানিয়্যাহ(বস্তুগত অগ্রসরমানতা)।জ্ঞানের জগতে দুটি ডিসকোর্স  আছে, একটি- হাদারাহ( সভ্যতা)ও অন্যটি মাদানিয়্যাহ (বস্তুগত অগ্রসরমানতা)। আমি বা আমরা বলতে যা বুঝায় সেটাই হাদারাহ। আর আমি বা আমরা যে বস্তুগত উপজীব্য সৃষ্টি করি সেটাই হলো মাদানিয়্যাহ(বস্তুগত অগ্রসরমানতা)। হাদারাহ বলতে জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণাকে বোঝায় যা অনেক বেশি নির্দিষ্ট এবং তা জীবন দর্শনের উপর নির্ভর করে। অন্যদিকে মাদানিয়্যাহ বলতে জীবন যাপনের উপকরণের বস্তুগত অবস্থা কে বোঝায় এবং এটি সুনির্দিষ্ট হতে পারে কিংবা সার্বজনীন হতে পারে। সুতারং হাদারাহ হতে উদ্ভূত বস্তুসমূহ অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও সমাজের আইকনিক হয়। আবার বিজ্ঞান ও তার অগ্রযাত্রা, শিল্প ও তার বিবর্তন ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ অনেকবেশী সার্বজনীন এবং তা কোন নির্দিষ্ট জাতির জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং তারা অনেক বেশি সার্বজনীন, যেমন শিল্প,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ।

মাদানিয়্যাহ (বস্তুগত অগ্রসরমানতা) আমাদের কাছে দুইভাবে হাজির হয়। এক. হাদারাহ থেকে উদ্ভূত হয়, দুই. বিজ্ঞান ও শিল্পের অগ্রযাত্রা থেকে উদ্ভূত হয়। বিজ্ঞান ও শিল্পের অগ্রযাত্রা শুরু হয় মুসলমানদের হাত ধরে যদিও বর্তমানে শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নাটাই পশ্চিমাদের হাতে। পশ্চিমা এই শিল্প,বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  হতে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ থেকে উপকারী জিনিস গ্রহণে তেমন কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু পশ্চিমা হাদারাহ (সভ্যতা) থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ সর্বক্ষেত্রে অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কারণ পশ্চিমা হাদারাহ-র  মৌলিক ভিত্তি ও চালিকা হলো হেডোনিজম। এছাড়া এর সামগ্রিক দর্শন ও লক্ষ্য ইসলামি হাদারাহ এর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। পাশ্চাত্য হাদারাহ প্রতিষ্ঠার মৌলিক নিয়ামক ছিলো জীবন থেকে দ্বীনকে তথা ধর্মকে ছুটি দেওয়া। অর্থ্যাৎ জীবনের সব পর্যায় তথা - ব্যক্তিগত, সামাজিক ও বৈশ্বিক  সব ক্ষেত্র থেকে দ্বীন বা দ্বীনের ভূমিকাকে অস্বীকার করা। সমাজ ও রাষ্ট্রের সব জায়গা থেকে দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র মসজিদ বা গির্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যা শুধু সমাজের অলঙ্কার হিসাবে শোভা পাবে কিন্তু সমাজের ড্রাইভিং প্যারাডাইম হিসাবে থাকতে পারবে না। 

এই হাদারাহ'র একমাত্র উদ্দেশ্য মুনাফা। মুনাফার অন্বেষণ করাই হচ্ছে সমগ্র জীবনের মূল উদ্দেশ্য। এই হাদারাহতে লাভ বা মুনাফাই হচ্ছে একমাত্র প্রভাবক। কাজেই পাশ্চাত্য জীবন পরিচালনার মূল মাপকাঠি হচ্ছে মুনাফা। কারণ তারা জীবনকে মুনাফা হিসাবে চিত্রিত করেছে। তাদের দৃষ্টিতে সুখ (happiness) হচ্ছে মানুষকে সর্বোচ্চ ঈন্দ্রিয়গত সুখ প্রদান এবং এ লক্ষ্যে মানুষকে প্রয়োজনীয় উপকরণে তারা সজ্জিত করে। পশ্চিমা হাদারাহতে মুনাফা অর্জনের তীব্র আকংখাই মূল উপজীব্য বিষয় এবং মুনাফা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ের উপরই তারা মনোযোগ দিতে আগ্রহী নয় এমনকি অন্য কোন বিষয়কে তারা স্বীকৃতি দিতেও প্রস্তুত নয়। ফলে এর উপর ভিত্তি করেই সকল কাজ নির্ধারিত হয়।এমনকি এই সভ্যতা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক কার্যাবলি গুলোও  বিকৃত করে ইন্দ্রিয়গত ভোগের মাধ্যম বানিয়েছে। অর্থ্যাৎ পাশ্চাত্য সভ্যতার একমাত্র নিয়ন্ত্রক ভোগবাদ যা তাদের আচার-ব্যবহার, মূল্যবোধ ও সততা এমনকি তাদের আধ্যাত্মিকতাওকে পরিপূর্ণ গ্রাস করে ফেলেছে।

অন্যদিকে  ইসলামি  সভ্যতার একমাত্র লক্ষ্য শুধু আল্লাহ্ র সন্তুষ্টি যা পাশ্চাত্য সভ্যতার একেবারেই বিপরীত। আল্লাহ্তাআলা তাঁর পাক জবানে মানুষের তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন- এক. ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ্ র,দুই. পৃথিবীকে পরিচালনা করা তথা প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে পরিচালনা করা, তিন. পৃথিবীকে আবাদ করা ইবাদাতের উপযোগী করে। ইসলামি সভ্যতা অবশ্যই অবশ্যই বস্তুগত ও অবস্তুগত  উভয় অগ্রসরতার নেতৃত্ব দিবে এবং  পৃথিবীকে একটি মানবিক সুশৃঙ্খলায় জুড়ে রাখবে  কিন্তু এ সমস্ত কর্মযজ্ঞ ও প্রতিবিধানের একমাত্র  উদ্দেশ্য ও চালিকা হবে আল্লাহ্ র সন্তুষ্টি । অর্থ্যাৎ দুনিয়াকে আবাদ করা ও  পরিচালনা করার মৌলিক দর্শন শুধুমাত্র আল্লাহ্ র সন্তুষ্টি। 

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত মাদানিয়্যাহ বস্তু যেমন, গবেষণাগারের উপকরণ (ল্যবোরেটরী ইক্যূইপমেন্ট), চিকিৎসা ও শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, গালিচা (কার্পেট), ইত্যাদি সার্বজনীন মাদানিয়্যাহ'র অন্তর্গত। এরূপ বস্তু সমূহ যা হাদারাহ থেকে উদ্ভূত নয়, কিংবা হাদারাহ'র সাথে সম্পর্কিত নয়, তা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব নিয়ন্ত্রনকারী পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি এক পলক দৃষ্টি দিলেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে তা মানুষকে শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। বরং পশ্চিমা সভ্যতাই বর্তমান মানুষের জীবনের গভীরে প্রোথিত দুর্দশা ও ভোগান্তির মূল কারণ। এই হাদারাহ, যা'র মূলে মানব জীবনের বিষয়গুলো থেকে দ্বীন কে পৃথক করা হয়েছে তা মানুষের ফিতরাহ'র পরিপন্থী। এবং এ সমাজে মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর কোন মূল্য নেই। উপরন্তু জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী হিসাবে মুনাফা এবং মুনাফা অর্জনই মানুষের মধ্যবর্তী সম্পর্কগুলোর মূল ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হয়। ফলত: অবধারিত ভাবে এটি চিরস্থায়ী দুর্ভোগ ও অশান্তি ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনা। যতক্ষণ পর্যন্ত মুনাফা হচ্ছে মূলভিত্তি, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই এতে সংঘর্ষ এবং মানুষের মাঝে সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠা করতে শক্তি প্রয়োগের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ হাদারাহ'র অনুসারীদের জন্য উপনিবেশবাদ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কারণ এখানে মুনাফাই জীবনের মূল ভিত্তি এবং নৈতিকতার কোন তোয়াক্কা করা হয়না। কাজেই, স্বাভাবিক ভাবেই আধ্যাত্মিকতার মূল্যবোধ যেমন উপেক্ষিত হয় ঠিক তেমনি অন্য যে কোন ভালো নৈতিকতার বিকাশও রুদ্ধ হয়ে যায় এবং জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম, আগ্রাসন ও উপনিবেশের উপর। বর্তমান বিশ্বে মানুষের মাঝে আধ্যাত্মিকতার সঙ্কট, চিরস্থায়ী উদ্বেগ, সর্বত্র মন্দের ব্যপক বিস্তৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যা স্পষ্টতই পশ্চিমা হাদারাহ'র ফলাফল। এটি সমগ্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর মাধ্যমে এরূপ ভয়াবহ পরিণতির দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে, এবং ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানবতার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলেছে, দুনিয়াকে পরিণত করেছে কান্নার উপত্যকায়।

ইসলামী হাদারাহ যা ৭ম শতাব্দী থেকে ১৮শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, তার একটি তথ্যচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এতে কখনোই উপনিবেশবাদী নীতি ছিলনা। অবশ্যই উপনিবেশবাদ ধারণাটি ইসলামী প্রকৃতি বিরোধী। তাই ইসলামের প্রকৃতি বা আকীদা জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়, যা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয় আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সীমারেখার মাধ্যমে। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই সুখ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। 

পরিশেষে, সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো আজ মুসলিম উম্মাহ  শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাদানিয়্যাহ গ্রহন করার চেয়ে পাশ্চাত্য হাদারাহ কে বেশি আপন করে নিয়েছে। মুসলিম উম্মাহ পাশ্চাত্যের এই হেমলকে বুঁদ হয়ে ইসলামের সুমহান জীবনবোধ ও দর্শনকে পায়ে ঠেলে কাপুরুষতা, আত্মমর্যাদাহীনতা ও জিল্লতীর  গ্লানি বয়ে চলেছে। যারা পৃথিবীকে যমযমে তৃপ্ত করবে তারাই পাশ্চাত্য হাদারাহ র হেমলক পান করে নীল হয়ে আছে। জগতের পাঞ্জেরি যখন পথ হারিয়ে ফেলে তখন ব্ল্যাকহোল ছাড়া কি গন্তব্য থাকে!! হে জগতে সংসারের মালিক!  ফিরিয়ে দাও সুমতি, কেড়ে নাও অমানিশা। আমরা যে আছি বড় ঘুটঘুটে অন্ধকারে!!!

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক

0 Comments:

Post a Comment