আলেয়ার আলোই আলোকিত এ ভূবন


আল্লাহ্ শুধু আমাদের স্রষ্টাই নয় বরং তিনি আমাদের প্রত্যেক অনুভব-অনুভূতির মালিক। কোনকিছুর প্রতি ভাল-মন্দ অথবা সম্মান-অসম্মান এই রুচিবোধ আল্লাহ্ তায়ালা মানুষের ফিতরতের মধ্যে দিয়ে রেখেছেন। ফিতরতের এই গুণাবলী সঠিকভাবে লালন করে আরও উৎকর্ষ করার মাঝেই মানুষের চির সাফল্য নিহিত। আল্লাহতায়ালার দুনিয়াতে নবীদের পাঠানোর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের ফিতরতের এই গুণাবলীকে আবাদ করে আল্লাহর সত্যিকারের প্রতিনিধি হওয়া। আল্লাহর কাছে সত্যিকার বান্দা হওয়ার সর্বপ্রধান শর্ত হলো অন্তরের শুদ্ধ অনুভূতি ও মাপ। আর অন্তর হলো শুদ্ধ রুচিবোধ ধারণ করার পাত্র।

মানুষের  অধঃপতন বলতে মূলত বোঝায় তার অন্তরের রুচিবোধ নষ্ট বা বিকৃত হওয়া। আর জাহিলিয়াত বলতে বোঝায় ভুলকে শুদ্ধ, ভালকে মন্দ, সম্মানকে অসম্মান, সত্যকে মিথ্যা মনে হওয়া। মানুষের জাহিলিয়াতের উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অন্যতম হলো ভুল জিনিষের মধ্যে সম্মান খোঁজা। অর্থাৎ যে জিনিষ সম্মানের নয় সেই জিনিষ অর্জন করতে পারাকে গৌরবের মনে করা। আল্লাহতালা মানুষকে সম্মানিত করেই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহতালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন - 

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا

নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।

আল্লাহতালা সম্মানিত বনী আদমকে সীমাহীন সম্মান দেওয়ার জন্য বার্তা এবং বার্তাবাহকে সাথে দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষার নিমিত্তে কে কত শুদ্ধ রুচি বা ইচ্ছা নিয়ে তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। নবীরা কিতাবের মাধ্যমে মানুষকে শুদ্ধ নীতি-নৈতিকতা, সম্মান-অসম্মান, উপলক্ষ্য-লক্ষ্য'র সঠিক মাপকাঠি শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্ত বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় আমরা-প্রচলিত দূষিত সমাজ- অলিক, মনগড়া, ভিত্তিহীন এবং অসৎ রীতিনীতিকে আমাদের নীতি-নৈতিকতা, সম্মান-অসম্মান, উপলক্ষ্য-লক্ষ্যকে সঠিক মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছি এমনকি এগুলোকে উপাস্য জ্ঞান করছি।  কেননা আমাদের সমস্ত হাসি-কান্না,ভালোলাগা-ভালবাসা, সুখ-দুঃখ এগুলোর সাথে জড়িত।

আমরা পাশ্চাত্য সভ্যতা দ্বারা এত বেশি প্রভাবিত যে আমাদের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক মুনাফা। সমাজে সম্মান পেশা দ্বারা নির্ধারিত হয় কারণ পেশা দ্বারা ভোগ ও ক্ষমতার মাত্রা নির্ণয় করা যায়। যে পেশা দ্বারা বেশি ক্ষমতা চর্চা ও ভোগ বেশি করা যায় সেই পেশা সমাজে তত বেশি আদৃত ও সম্মানিত। কিন্তু সমাজের সম্মান কখনো পেশা দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না।বরং মানব সমাজের সম্মান নির্ধারিত হবে মানবিক গুণাবলীর অসীম সৌন্দর্যে। মানুষের সম্মান মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যে অর্থ্যাৎ  কে কত বেশি সততা , বিনম্রতা, দয়া-ভালবাসা, আত্মত্যাগ, পরার্থপরতা, কৃতজ্ঞতা, উদারতা ও মহানুভাবতা ইত্যাদি মানবিক সৌন্দর্য দিয়ে নিজের জীবনকে সাজাতে পারে সেটাই ছিলো প্রকৃতই সম্মান। পেশা যদি সম্মানের মাপকাঠি হতো তাহলে মহামানবরা বিশেষকরে নবীরা সবচেয়ে অসম্মানীয় ছিলেম (নিউজুবিল্লাহ)। কেননা তাঁরা বেশিরভাগ ছিলেম আমাদের সমাজের নিকৃষ্ট পেশা রাখাল আথবা আমাদের পরিভাষায় ফেরিওয়ালা ব্যবসায়ী। কিন্ত বড় আফসোসের বিষয় আজকের জাহেলী সমাজ ঐ পেশাগুলোকেই সম্মানের রাজটীকা পরিয়েছে যেগুলি দ্বারা কল্যাণের নয় বরং সবচেয়ে বেশি জুলুমকে করা যায়, অন্যকে নিজের হীন অধীনস্থ বানানো যায়, অন্যকে হেয়ো করা যায়, নিজের ফাঁকা দম্ভ ও অহংকারকে চরিতার্থ করা যায় এবং দূর্বলদের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে চাটুকারিতার অমোঘ অমৃত আস্বাদন করা যায়।

তারপরও পেশাকে যদি আমরা সম্মানজনক হিসাবে দেখি তাহলে এক্ষেত্রে প্রথমত বিবেচ্য ছিল এটা কতটা হালাল'। তারপর পেশাটা কতখানি কল্যাণপূর্ণ, সেবাধর্মী এবং আত্মশিক্ষামূলক।আমরা পেশাকে যদি সম্মান দিতেই চাই ঐসকল পেশা সর্বাধিক সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত যে পেশার দ্বারা যত বেশি কল্যাণমূলক ও মানবিক গুণাবলী ফুটিয়ে তোলা যায়। 

এরচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় যাঁরা সত্যিকার কল্যাণপূর্ণ এবং নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেন, অর্থ্যাৎ যাঁরা মহান শিক্ষাকতা পেশার সাথে জড়িত তাঁরা নিজেরাই নিজেদের কাছে বড় বেশি আত্মমর্যাদাহীন।বরং তাদের কাছে তারাই বেশি সম্মানী যারা শুদ্ধ জীবনবোধ ও নীতি-নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজে অস্বাভাবিকভাবে  ফুলে ফেঁপে উঠেছে এবং জুলুমের চাবুক বড় নিষ্ঠুরভাবে চালাচ্ছে। শুধু এখানেই শেষ! না বরং তাদের মত হওয়াকে জীবনের স্বার্থকতা মনে করছে।পানিপান যদি পিপাসা অধিক বৃদ্ধি করে, তাহলে এ সে জাতির ভাগ্যে অমানিশা ছাড়া কিছুই জুটতে পারে না। 

এই আসমান এবং জমিনের সম্মান এবং প্রতিপত্তির একমাত্র মালিক আল্লাহতালা। আর মানুষ সৃষ্টিকর্তার বড় দূর্বল সৃষ্টি কিন্ত দুর্বলতা তখনই সৌন্দর্য এবং সম্মানে রূপ নিবে যখন এই দূর্বল মানবজাতির প্রত্যেক কর্মোদ্দীপনায় মহান আল্লাহতালাই হবে  একমাত্র উদ্দীপক।  এ কথাই আল্লাহ্ তাঁর পাক কালামে জানিয়েছেন এভাবে --

 وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَٰكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ

সম্মানতো শুধু আল্লাহ তাঁর রসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। 63-Al-Munafiqun : 8

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক 


0 Comments:

Post a Comment