ইসলামে রাজনীতি


শব্দ বা পরিভাষা সময়ের পরিক্রমায় তার আবেদন হারিয়ে দূর্বল, জীর্ণ-শীর্ণ নূজ্য এমনকি  অনেক সময় মৌলিক আবেদন হারিয়ে উল্টো বিকৃত অর্থ, অনুভব ও অনুভূতি প্রদান করে। এই বিকৃতির সবচেয়ে  বেশি শিকার সম্ভবত 'রাজনীতি' শব্দটি। রাজনীতি একটি পজিটিভ ও বহুমুখী শব্দ। বাংলায় যাকে আমরা রাজনীতি বলে থাকি তার মৌলিক দর্শন হলো মানুষকে  নৈরাজ্য থেকে উদ্ধার করে একটি একক চেতনায়- সেটা জাতি হোক বা ভাষা হোক কিংবা সেটা ধর্ম হোক- উদ্বুদ্ধ কোন জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী কোন দল এমন কোন নিয়ম-নীতি বা তন্ত্রের চর্চা করে যার ফলে ঐ জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণ সাধিত হয়। রাজনীতির সবচেয়ে সহজ  দর্শন হলো মানুষের সমন্বিত, সার্বিক ও চিরস্থায়ী কল্যাণ করা। এটা বাস্তবায়নের  জন্য বাস্তবিক ও কার্যকর পন্থা একটি নেতৃত্ব। 


এছাড়া শব্দগতভাবে 'রাজনীতি'  বলতে বুঝি নীতির রাজা অর্থাৎ নীতিসমূহের মধ্যে যে সব নীতি সবচেয়ে উত্তম  যা মানব সমাজের এমনকি গোটা পৃথিবী নামক গ্রহের জন্য  সবচেয়ে উপযোগী এবং একমাত্র আল্লাহ পাকের আরাধনা ও সন্তুষ্টি বিধানের জন্য জীবনচর্চার  নীতিগুলোকে রাজনীতি বলতে পারি।  এভাবে রাজ-নীতিকে বুঝলে  ইসলামকে রাজনীতি বলা অনেকটাই বাঞ্ছনীয়। আবার অনেকে বলবে ইসলাম এই পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা ঠিক নয় কারণ ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা।  অবশ্যই এ কথা ঠিক কিন্তু  নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামকে রাজনীতি বলতে চাচ্ছি কারণ রাজনীতি ও ইসলামের মৌলিক জীবনদর্শন এক‌ই অর্থাৎ মানব কল্যাণ। আল্লাহ তাঁর  কিতাবে একথাই বলেছেন- 

সূরা আল ইমরান (آل عمران), আয়াত: ১১০

کُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَتَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَتُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ ؕ 

অর্থঃ তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।


তবে আমি মোটেও পশ্চিমা থেকে ধার করা রাজনীতি ও রাজনৈতিক চর্চার কথা বলছি না বরং ইসলাম যে একটি শাশ্বত রাজনীতি সেটাই বলার চেষ্টা করছি।  নিশ্চয় এই রাজনীতির রূপরেখা ও চর্চা  এর নিজস্ব লক্ষ্যে ও ঢঙে হবে।  ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে চারটি স্তম্ভ যথা নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ্জ্ব ‘ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ ও ঐক্যবোধ সৃষ্টি করে’।–[ হামিদ এনায়েত, Modern Islamic Political Thought, (লন্ডন, ম্যাকমিলান, ১৯৮২) পৃঃ ২] ইসলামের এ স্তম্ভগুলোর উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তির আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা সাধন নয় বরং এর আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক তাৎপর্য রয়েছে। এ সব স্তম্ভসমূহ মানুষের আচরণ ও কার্যকলাপের সাথে ঘনিষ্টভাবে সংযুক্ত। নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বাসীদের জন্য যে নামাজ ফরজ করা হয়েছে (৪:১০৩), জামায়াতের সাথে যা আদায় করা বিধেয়, সে নামাজের মাধ্যমে একজন ঈমানদার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে যাতে রয়েছে চিন্তন, আবেগগত অনুপ্রেরণা ও শারীরিক সঞ্চালন। নামাজে বিশ্বাসী মানুষেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, নামাজ আদায়ের জন্য একজনকে ইমাম নির্বাচিত করা হয়, মহান আল্লাহর মহিমা ঘোষণা; করে নামাজীরা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে প্রার্থনা করে, ‘হে প্রভু, আমাদের সরল সঠিক পথ দেখাও’। নামাজের প্রার্থনার মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে কল্যাণময় জীবনের নীতিমালা, সামাজিক ন্যায্যতা ও অধিকার, নেতৃত্ব ও আনুগত্য, দায়িত্ববোধ ও দায়িত্ব সচেতনতা এবং বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব। 


ইসলামী আত্মিক বা নৈতিক মূল্যবোধ রাজনীতির নির্দেশনা ও গতিপথ নির্ধারণ করে দেয় এবং রাজনৈতিক আচরণ বিধি ইসলামের আদর্শিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ হতে উৎসারিত। তাই রাজনীতির মুখ্য বিষয়সমূহ তথা আদল এবং ইহসান প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা বিধান করবে এমন ন্যায়পরায়নদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ, মন্দের শিকড় উৎপাটন করে কল্যাণকর জীবন প্রতিষ্ঠা-এসব কিছুই ইসলামের প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং ইসলাম এসব কিছুকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। এ সমস্ত কর্মকাণ্ডকে ইসলাম মৌলিক গুরুত্ব প্রদান করে, তবে পার্থক্য এটুকু যে, এ সমস্ত কিছু তথা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ইসলামের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের মূল ও বিস্তৃত কাঠামোর ভিতরে সংঘটিত হতে হবে। ধর্ম ও রাজনীতি তাই ‘একই ইসলামী মুদ্রার দু’পিঠ’-নয়। –[ জি.এইচ জ্যানসেন, ‘Militant Islam’ (লন্ডন, প্যান বুকস, ১৯৭৯), পৃঃ ১৭] তাদেরকে এমনভঅবে বিন্যস্ত করা যায় না যে, একটি স্বাধীন সত্তা এবং একটি অন্যটির উপর নির্ভরশীল। ইকবালের ভাষায় প্রকৃত সত্য এই যে ‘ইসলাম হচ্ছে দ্ব্যর্থহীনভাবে একক বাস্তব সত্য নীতি, যা সুস্পষ্টভাবে এক ও অভিন্ন, যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন’।–[ স্যার মোহাম্মদ ইকবাল, The Reconstruction of Religious Thought in Islam’ (লাহোর, শেখ মোহাম্মদ আশরাফ, ১৯৭১), পৃঃ ১৫৪]।


এই ইসলাম বা ইসলামের রাজনীতি সময়ের পরিক্রমায়    আবেদন, আস্থা বা মোলিক সৌন্দর্য  মেঘে ঢাকা পড়েছে যার দায় মোটেও ইসলাম বা ইসলামের রাজনীতির নয় বরং এর দায় যারা ইসলাম বা ইসলামের রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। খোলাফয়ে রাশিদাগণ রাজনীতির যে সত্যিকার শাশ্বত সৌন্দর্য, মানবিকতা, আদল ও ইহসান পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিলেন তা সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তিতে   এমন কিছুলোক এটা ধারন করেছিলেল তাদের সেচ্ছাচারিতা, বিলাসিতা, জুলুম, পারিবারতান্ত্রিকতা ও   দীনহীনতা  ইসলাম বা রাজনীতির এই পরিভাষা দূর্বল, জীর্ণ শীর্ণ  হয়ে  মানুষের কাছে আবেদন ও আস্থা  হারিয়েছে। যে ইসলাম গোটা পৃথিবীর পিপাসা মিটিয়েছে সেই ইসলাম থেকে  মানুষ মুখ ফিরিয়ে বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্র তৈরি করেছে। এমনকি বেশিরভাগ মুসলমান কিছু আচার এবং আনুষ্ঠানিকতাকে ইসলাম মনে করে। এসবের মৌলিক কারণ পরবর্তিতে যারা ইসলামকে ধারন করেছে তাদের কাছেই ইসলামের সমন্বিত রুপ হারিয়েছে। তাদের কাছ থেকেই আমরা বুঝেছি ইসলাম শুধু ব্যক্তি ও মসজিদ কেন্দ্রিক যদিও 95% এর বেশি মুসলমান নিয়মিত মসজিদে যায় না। আমার সবচেয়ে দূর্ভাগ্যের প্রশ্ন হলো মুসলমান কেমন করে শাশ্বত সুন্দর ইসলামকে থেকে বিমুখ হলো? এর দায় কোন ক্রমেই এড়াতে পারবে না যারা ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে। এভাবেই শব্দ বা পরিভাষা ব্যক্তিদের কারণে তার আবেদন হারিয়ে ফেলে আবার কিছু ব্যক্তিরাই এই পরিভাষায় হারোনো যৌবন ফিরিয়ে নিয়ে আসে, নতুন করে তরঙ্গায়িত করে। ফিরে পায় তার সত্যিকার রূপ ও যৌবন।  এই জন্য‌ই আল্লাহ প্রতি শতাব্দীতে একজন মুজাদ্দিদ পাঠান যিনি ইসলামের পরিভাষায় হারানো আবেদন ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। 


ইসলাম ও রাজনীতির সবচেয়ে আদর্শিক সম্পৃক্ততার উদাহরণ হচ্ছে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা), যাকে কুরআন সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে (উসওয়াহ হাসানা ৩৩ : ২১)। অন্যান্য বিষয়াবলীর মধ্যে তাঁর মদীনায় হিজরতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ক্ষমতা-সম্পর্কের পুনর্গঠন করে ঐশী ইচ্ছার অনুবর্তী করা। এখানেই ইসলামের প্রথম রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, যার বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক প্রধান ছিলেন মহানবী মোহাম্মদ (সা)।তিনি নামাজের ইমামতি করতেন, জি-হা-দ পরিচালনা করতেন, বিচারক হিসাবে কাজ করতেন এবং জ্ঞান, নীতির পরিমাপ  নির্ধারণ করতেন। সঠিক পথে পরিচালিত খোলাফায়ে রাশেদা তাঁদের শাসনকালে মহানবী (সা) কে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসরণ করেছিলেন। উম্মাহর নেতা হিসানে তিনি শরীয়াহ বাস্তবায়ন করতেন, ধর্মীয় আদর্শ পূর্ণভাবে সংরক্ষণ ও সমুন্নত এবং এর বিশুদ্ধতা বজায় রাখতেন। তৃতীয় খলিফা উসমানের সময় ইসলামী সভ্যতা ‘প্রাচ্য হতে পশ্চিমের আটলান্টিক মহাসাগরের তীর’ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।–[ Marshall Hodgson, The venture of Islam Conscience and History in A World of Civilization’ (শিকাগো, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস, ১৯৭৪), ভলিউম-১।


আমরা যদি পৃথিবীর মানুষকে সত্যিকার পিপাসা মিটাতে চাই আমাদেরকে ধারণ করতে হবে ইসলামের সমন্বিত ও পরিপূর্ণ শাশ্বত সৌন্দর্য। আমাদেকে সাজাতে হবে রাসুল (সাঃ) ও সঙ্গিদের চেতনায়, বোধে, লক্ষ্যে এমনকি তাঁদের সমগ্র আত্মিক ও বাহ্যিক সংস্কৃতিতে। আমাদের জীবন বাজি রাখতে হবে প্রত্যেক মানুষের কল্যাণের জন্য। আমাদের কেঁদে উঠতে হবে একজনেরও কান্নার জন্য, হেসে উঠতে যে কার‌ও হাসি দেখে। সবাইকে শিখাতে হবে সত্যিকার হাসি-কান্না কিসে?! আধুনিক মানব  সভ্যতাকে উদ্ধার করতে হবে সংকীর্ণতার চোরাবালি থেকে। এই সভ্যতাকে উদ্ধার করতে হবে মানুষ মানুষের নির্মম গোলামি থেকে মহান রবের আনুগত্যের দিকে। এটা সম্ভব হবে যখন আমরা ইসলাম সত্যিকার ধারক ও নমুনা হতে পারব। আর এটাই ইসলামের রাজনীতি।

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক

0 Comments:

Post a Comment