আরবী ভাষা শিক্ষা কেন সময়ের দাবী

ভাষার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে কিন্তু ভাষা এমন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী উপাদান যা মানুষকে অন্য সমস্ত প্রাণিজগৎ থেকে আলাদা করেছে। এই ভাষার কারণেই    মানব সভ্যতা তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই বিকাশ ও প্রবৃদ্ধি। ভাষার জগতে আরবী ভাষা সবচেয়ে অনন্য ও সমৃদ্ধ। ইসলামি উম্মাহ্ র সবচেয়ে অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য নিয়ামক হলো আরবি ভাষা। কারণ এটা ইসলামের ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা মৌলিক ও বস্তুনিষ্ঠ মাধ্যম হলো আরবি ভাষা। মানুষের মনের ভাব ও উপলব্ধি বোঝার সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো ভাষা। 

কোরআন-সুন্নাহ বোঝার মাধ্যম হিসেবে আরবি ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।যদিও  নিগূঢ় রহস্য উদ্ঘাটন ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব উপলব্ধিতে ভাষার সাথে আর‌ও অনেক বিষয় জড়িত কিন্তু ভাষা হিসেবে আরবি অদ্বিতীয় মাধ্যম।এজন্য যুগে যুগে ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ আরবি শেখার প্রতি উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা আরবি ভাষা শেখো। তা তোমাদের দ্বীনের অংশ।’ মাসবুকুজ জাহাব ফি ফাদলিল আরব ওয়া শারফুল ইলমি আলা শারফিন নাসবি : ১/৯

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। আর প্রিয় নবী (সা.)-কে আরবি ভাষায় কোরআন-সুন্নাহ প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন। দ্বীনের প্রথম অনুসারীরা ছিল আরবি ভাষী। তাই দ্বীনের গভীর জ্ঞানার্জনের জন্য এই ভাষা আয়ত্তের বিকল্প নেই। আরবি চর্চা করা দ্বীনেরই অংশ ও দ্বীনের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।’ মাজমুউল ফতোয়া : ৮/৩৪৩

মূলত পৃথিবীর যেকোনো ভাষায় প্রধানত তিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে । এক. চিন্তাজগতের প্রথম সিঁড়ি, দুই. জ্ঞানজগতের আধার এবং যোগাযোগ, তিন.  ভাষণ-বক্তব্য ও আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু আল্লাহতায়ালা আরবি ভাষায় অহি অবতীর্ণ করায় এই ভাষার মধ্যে কিছু বিশেষ দিক আছে  তা হলো ' নূর' যা মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে- চিন্তার উন্মেষ ঘটায় ও অন্তর চক্ষু উন্মোচিত হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই ভাষা আল্লাহ এবং রাসূলের ভাষা।

 আল্লাহতায়ালা বলেন

,بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُّبِينٍ

‘সুস্পষ্ট আরবি ভাষায় আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি।’ সুরা শুআরা : ১৯৫

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আবুল হুসাইন আহমদ বিন ফারেস (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ কোরআনকে বয়ান বা সুস্পষ্ট শব্দ দিয়ে অভিহিত করেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, অন্য ভাষায় এ বৈশিষ্ট্য নেই এবং মানমর্যাদায় আরবি ভাষা সব ভাষার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’ আস সাহিব ফি ফিকহিল লোগাহ : ৪/১

 আল্লাহতায়ালা তাঁর কালামে আর‌ও বলেন,

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ

‘আমিই আরবি ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ করেছি। যেন তোমরা উপলব্ধি করতে পারো।’ (সুরা ইউসুফ :২)।

ইসলামের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানী আল্লামা ইবনে খালদুন (রহ.) সেই সময়ের প্রেক্ষাপটের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ইসলাম আগমনের পর আরবের অনেকে হেজাজ ছেড়ে অনারবদের সঙ্গে মেলামেশা আরম্ভ করে। ফলে নবাগত আরবদের কথা শুনতে থাকায় প্রকৃত আরবদের শ্রবণশক্তিতে পরিবর্তন ঘটে। অথচ শ্রবণশক্তি ভাষা শেখার অন্যতম একটি উপকরণ। তখন বিজ্ঞজনেরা ভাবলেন, এমন অবস্থা দীর্ঘ হতে থাকলে আরবদের শ্রবণশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। এতে কোরআন-হাদিস বোঝাও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে তারা নিজেদের যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে ভাষা শেখার মূলনীতি প্রণয়ন করেন। বিভিন্ন নিয়মনীতির আলোকে ভাষার সব শব্দ ও বাক্যকে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।’ (আল মুকাদ্দিমা :৪২৬)।

অধিকন্তু, কোরআনের অনেকগুলো আলৌকিকত্বের মধ্যে একটি হলো তার ভাষা, যা চোখ দিয়ে দেখা যায় না, অন্তরে উপলব্ধি করতে হয়। আরবি ভাষা বোঝা ছাড়া এই আধ্যাত্মিকতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সর্বোপরি কোরআনের অলংকার, ছন্দ ও তথ্যের উপস্থাপন অলৌকিক। আল্লাহতাআলা কেয়ামত পর্যন্ত মানব জাতিকে এর চ্যালেঞ্জ করে রেখেছেন। কেউ এর মতো একটা সুরাও রচনা করতে পারবে না। আল্লাহতাআলা বলেন,

وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُواْ بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ وَادْعُواْ شُهَدَاءكُم مِّن دُونِ اللّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

‘যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মতো একটি সুরা রচনা করে নিয়ে এসো।’ (সুরা বাকারা :২৩)।

আমরা যারা অনারব তাদের বেশিরভাগ ইসলাম বুঝার  মাধ্যম অনুবাদ কিন্তু অনুবাদ কখনই আল্লাহর কালাম নয়। একটা ভাষার অনুবাদ কখনই অনুবাদকৃত ভাষাকে পুরোপুরি ধারন করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ একটি বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পড়ে যদিও কবিতার ভাবার্থ বোঝা যায়, কিন্তু কখনই কবিতার আসল স্বাদ ও সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় না। বরং অনুবাদ আমাদের সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতায় নিক্ষেপ করে। 

এই গোলকায়নের যুগে আরবি ভাষাভাষীদের চাহিদা গত এক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির জ্ঞান বিশ্বে একটি পার্থক্য সৃষ্টিকারী নিয়ামক হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে।একটি জাতির সার্বিক উন্নতিতে যেসব বিষয় সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তার মধ্যে ভাষা অন্যতম। ভাষা শুধু মনের ভাব প্রকাশের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি দেশ বা জাতির অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিকাশেও অগ্রণী ভূমিকা রাখে। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে আরবি ভাষার অবস্থান ষষ্ঠ নম্বরে। পৃথিবীব্যাপী প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলে। যার মধ্যে প্রধানত সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো উল্লেখযোগ্য। গোটা পৃথিবীতে বর্তমানে ২২টি দেশের রাষ্ট্রভাষা আরবি। অন্য মুসলিম দেশগুলো ছাড়াও খোদ আমেরিকা ও ইউরোপে আরবি ভাষার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।

জাতিসংঘ, আফ্রিকান ইউনিয়ন, ওআইসিসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিশিয়াল ভাষা আরবি। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠালগ্নে দাপ্তরিক ভাষা ছিল ৫টি। পরে আরব নেতাদের প্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরবিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ আরবি ভাষার গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০১২ সালের অক্টোবরে ইউনেসকো নির্বাহী পরিষদ বৈঠকের ১৯০তম অধিবেশনে ১৮ ডিসেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। 

আরবি ভাষার সঙ্গে অনারব মুসলিম দেশের লোকের আত্মার সম্পর্ক।মুসলিম উম্মাহ্ র আপামর জনসাধারণ আরবি ভাষাকে পরম শ্রদ্ধা করে। আরবি ভাষার যেমন রয়েছে ধর্মীয় গুরুত্ব, তেমনি রয়েছে বৈষয়িক প্রয়োজনীয়তা। পৃথিবীর প্রায় ৪৫ কোটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আরবি। ২৫ কোটি মানুষ আরবিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। ২৫টি দেশের দাপ্তরিক ভাষা আরবি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিবেচনায় আরবি ভাষা বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্ব রাখে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি ধরা হয় রেমিট্যান্সকে। এ রেমিট্যান্সের সিংহভাগই অর্জিত হয় আরবি ভাষার দেশসমূহ থেকে। এ দেশের জনগণ যখন আরব দেশে যায়, তখন তারা ভাষা না জানায় বেশ বিড়ম্বনায় পড়ে। তারা যদি ভালোভাবে আরবি ভাষা জানত, তবে লোকগুলো আরব দেশে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে পারত। তাদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা আরও বেশি আদায় করে নিতে পারত। তাই বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে আরও চাঙা করার লক্ষ্যে হলেও আরবি ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

একথা বোঝা আমাদের জন্য দিনের আলোর মতো পরিস্কার যে যদি আমরা সত্যিকারের মুমিন হতে চাই এবং সাথে সাথে অনাগত ভবিষ্যতকে নেতৃত্ব দিতে চাই এবং ইসলামকে জিতাতে চাই তাহলে আরবি ভাষা শিক্ষা আমাদের‌ পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের বোঝার তৌফিক দিন আমিন।

Md. Abdur Rahman

Posted in

Spread the love