সময়ের পরিক্রমায় কারবালা আরও প্রাসঙ্গিক


পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। এর চেয়ে বেশি সত্য পৃথিবীর ইতিহাস জালিম ও মজলুমের ইতিহাস। ইতিহাসের আজকের এই দিনে হযরত হোসাইন রাযি.ও যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সেটিই সবচেয়ে সঠিক এবং অনাগত মুসলিম উম্মাহ ও মজলুমের একমাত্র আলোকদীপ্ত প্রদীপ। কারণ, সেটিই ছিল তাঁর করণীয়। তিনি তা না করলে কেয়ামত পর্যন্ত বিচ্যুত শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কোনো দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে থাকতো না। যখন কোনো ভুল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সমাজে অনাচারের ধস নামার অশঙ্কা জেগে উঠে আর ভালোর আহবান ও মন্দের  প্রতিরোধ এবং তাকওয়া-তাহারাত জাগানো ও খোদাভীতি ও ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির পরিবর্তে শুরু হয় ভ্রমণ-শিকার ও আমোদ-প্রমোদের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধির আয়োজন, চলতে থাকে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার  অপব্যবহার তখন আমাদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত থাকা দরকার হয়ে পড়ে যে, এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কোনো বান্দা দাঁড়িয়ে গেছেন, এসবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এবং প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছেন। যদি এমনটি না ঘটতো তাহলে আপনারা  ইসলামের পরবর্তী যুগের ইতিহাসে  দুঃশাসক, জালেম ও ফ্যাসিস্টদের ব্যাপারে কেবল সমর্থন ও নীরবতার নমুনাই দেখতে পেতেন। সবাই শুধু এ পংক্তিরই অনুসরণ করত-

বাতাস যেদিকেই বয়ে যাক

তুমি এই একদিকেই এগিয়ে চল

তাদের মনোভাব থাকত এমন যে, যত দুঃশাসনই প্রতিষ্ঠা হোক আর যত দুরাচরী সরকারই ক্ষমতায় আসুক-আমরা শুধু তাদের আনুগত্য করে যাব। এটাই আমাদের তকদীর। কারণ আমাদের সামনে দুঃশাসনের আনুগত্য না করার ক্ষেত্রে কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কিছু করার মতো অনুসরণীয় কোনো উদাহরণ নেই। তাছাড়া এ আশংকাও থাকতো যে, এতে ইসলামী ঐক্যের ওপর  নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মুসলমানদের সংঘবদ্ধতা পড়ে যাবে ঝুঁকির মুখে। তাই সবাই নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকত।

এজন্যই হযরত হোসাইন রাযি.-এর এই দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে যে, না, এভাবে চলবে না। সবাই চোখবন্ধ আনুগত্য করবে না। বরং কিছু লোকের এমনও হওয়া উচিত যে, এ দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরোয়াহীনভাবে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এরই ফল হল, পরের যুগের মুজাহিদদের ইতিহাস। যদি আপনারা পড়ে দেখেন সে ইতিহাস, অধ্যয়ন করেন তাদের মনস্তত্ব ও মানসিকতা। তাদের সংলাপ ও বক্তব্য তাহলে অবশ্যই অনুভব করবেন বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দেশে যেসব সংস্কারবাদী আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে, যেসব বৈপ্লবিক প্রয়াস উচ্চকিত হয়েছে, সেসব কটিরই পেছনে হযরত হোসাইন রাযি.-এর স্থাপিত দৃষ্টান্ত ভূমিকা রেখেছে। যুগে যুগে মজলুম বা সংস্কারবাদীদের আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহস বাড়িয়ে তোলা আর সংগ্রামের আবেগ ও প্রত্যয় জাগিয়ে তোলার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল হযরত হোসাইন-এর এই দৃষ্টান্ত। 

এই দৃষ্টান্ত  আমাদের এই প্যারাডাইম দেয় যে, এজাতীয় প্রতিরোধ শিশুসুলভ কোনো চাঞ্চল্য নয়, নয় কোনো উত্তেজক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অস্থিরতা। বরং এটি হচ্ছে হোসাইনী সুন্নত। হযরত হোসাইনের আদর্শ-নীতি। এ প্রতিরোধের ধারা তথা এই হোসাইনি আদর্শ আমাদের ধমনীতে প্রবহমান না থাকে তাহলে আমাদের একমাত্র নিয়তি গোলামির জিঞ্জির ও ফ্যাসিস্টদের উদোম নৃত্য। সমাজে ফ্যাসিবাদের জাল তখনই আষ্ঠেপিষ্ঠে ধরে যখন ফ্যাসিস্টদের নেমকাহারি এলিয়েনেটেড সেকুলারিস্ট ও সালাফিরা হোসাইনি আদর্শ ও ঐতিহ্য আমাদের স্মৃতি ও হৃদয় থেকে ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করে। 

আমাদের  সমাজের জন্য অবশ্যই ইমাম হোসেইন বিশেষভাবে একজন  প্রেরণা ও সম্ভাবনার নামও। কারবালা আমাদের ইতিহাসেরই প্যারাডাইম, যেখানে জালেম ও মজলুমের মধ্যে চিরন্তন লড়াই চলমান। 

কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়ঃ

 "একদিকে মাতা ফতেমার বীর দুলাল হোসেনি সেনা, 

আর দিকে যত তখ্ত-বিলাসী লোভী এজিদের সেনা"

আমি মনে প্রাণ বিশ্বাস করি আজও  ইমাম হোসেইনের আদর্শ বুকে ধারণ করতে পারবেন, মজলুম জনগণের সামনে যারা হোসেইনি উত্তরসূরি  হিসাবে হাজির হইতে পারবেন; কোন ফ্যাসিবাদ তাদেরকে পরাজিত করতে পারবেন না। সলিমুল্লাহ খান গতবছর লিখেছিলেন, আমাদের হৃদয়ের একটা টুকরা হইলেন ইমাম হোসেইন। এই টুকরাটা আমাদের অন্তরের থানাটোস, বা ডেথ ড্রাইভ তথা মৃত্যুর প্রেরণা। ইমাম হোসেইন আমাদের জন্যে শাহাদাত ও বিপ্লবের প্রেরণা। এবং মাহদীয় সম্ভাবনার আধারও।"

বর্তমানেও আমরা  একই কারবালার বধ্যভূমির হোসাইনি সেনা । নজরুলের মতে, হোসেনি সেনারা হইল  ইসলামের সিলসিলা বহনকারী। আর এজিদিরা হইল বৈষম্য ও জুলুমের পক্ষের সৈনিক।  আজও যদি আমরা ফ্যাসিস্টদের থেকে  মুক্তি পেতে চায় তাহলে আবার  হোসাইনি চেতনা ধারণ করে পর্বতসম প্রত্যয়ী ঘোষণা দিতে হবে-

"যে পয়গাম এসেছিল হোসাইন ইবনে আলীর কাছে

আমি আনন্দিত, সে ওফাদারির পয়গাম এসেছে এখন আমারও জন্য।"

প্রভাত আলোকচ্ছটা  হয়ে ফুটুক হোসাইনি সুন্নাহ।

0 Comments:

Post a Comment