ভাষা ও প্রজ্ঞার স্বরুপ, সম্পর্কের বিশালতা ও আমাদের বিচ্ছিন্নতা


পৃথিবীতে মানুষই হলো একমাত্র প্রাণী যাদের ভাষা আছে, এই ভাষার কারণে আমরা অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা। কিন্তু আমাদের হাসি, কান্না, খাওয়া,ঘুম,ভালবাসা ও ঘৃণার ভাষা বলা যায় এক‌ই রকম। আমাদের অনুভূতি, অনুভব, চিন্তা, চেতনা, আবেগ ইত্যাদি প্রকাশ, প্রক্রিয়াজাত ও নতুন সৃষ্টিশীলতা সব কিছুই আমরা করি ভাষার মাধ্যমে। 

যদিও আমাদের সাধারণ কর্মকাণ্ডগুলার ভাষা একই, কিন্তু আমরা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ভাষায়,বিভিন্ন অনুভূতিতে,বিভিন্ন সংস্কৃতিতে অন্যেদের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় অবতীর্ণ হ‌ই। আমরা বেশীরভাগ সময় আমরা ভাষা দিয়াই একে অন্যের সাথে যোগাযোগ, জানা,  বোঝা ও শিক্ষার  চেষ্টা করি, কিন্তু ভাষা দিয়া সম্পূর্ণ জানা,বোঝা, চিন্তা ও হৃদয়ঙ্গম করা কখনই হয়ে উঠে না। লেখক যেমন আবেগ, অনুভব, অনুভূতি সম্পূর্ণরূপে ভাষার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারে না ঠিক তেমনি লেখকের ভাষা পাঠক পুরাপুরি বুঝে উঠতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে ভাষা দিয়ে যেটা বোঝাতে চাওয়া হয় তার উল্টো বোঝে। আবার  মানুষের চিন্তা, চেতনা,  অনুভূতিগুলো ভাষার মাধ্যমে পরিমাপ নির্ধারণ করা যায় না। এমনকি একটি ভাষা বা উপভাষা  অপর একটি ভাষা বা উপভাষাকে কখনোই ধারন করতে পারে না। এভাবেই শুরু হয় পারিবারিক, সামাজিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চিন্তা, চেতন, শিক্ষা ও রুচির গ্যাপ। এখন এই সমস্যা মানুষের ভাষা ভিন্ন অথবা ডায়ালেক্ট ভিন্ন হওয়ার কারণে হয় না। মূল সমস্যাটা হইলো, পৃথিবীর কোন ভাষা অথবা কোন ডায়ালেক্ট  মানুষের এই বাস্তবতাকে এক্স্যাক্টলি বর্ণনা করতে পারবে না। এইটাই ভাষার সীমাবদ্ধতা। 

পৃথিবীর সব মানুষের কান্না বা হাসির রুপ এক‌ই কিন্তু  যখন‌ই এটা শব্দে বা ভাষায় বর্ণনা করা হয়  তখন হাজার মানুষের কাছে হাজার রুপে ধরা দেয়। আবার বিভিন্ন  ভাষার বিভিন্ন  পরিভাষার রুপ, গভীরতা ও আবেদন আবহাওয়া, সমাজ, সংস্কৃতি, সময়,  কাল,  ব্যক্তি,বয়স, অভ্যাস, রুচি, লিঙ্গ, ধর্ম, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমরা যেই বাস্তবতায় বসবাস করি তাঁর খুব অল্পই ভাষা দিয়া বর্ণনা করা যায় এবং একে অন্যের সাথে যে ভাবের আদান প্রদান, শিক্ষাদীক্ষা করতে চাই তাও খুবই অল্প ভাষা দিয়া করা যায়। সেই জন্যেই আমরা আবেগের আতিশয্যে বেশির ভাগ  ক্ষেত্রে আমরা ভাষাহীন হয়ে পড়ি। কারণ সেই আবেগ প্রকাশ করার ভাষা আসলেই নাই।  ভাষা হলো কিছু শব্দের সমষ্টি। আর এই শব্দগুলা হলো মানবের অতলান্তিক মনের অনুভূতি, রহস্য ও প্রজ্ঞা বর্ণনা করার জন্যে ব্যবহৃত সিম্বল। এই সিম্বলগুলা দিয়া মানব মনের বা সমাজের একটা আবছা অবয়ব বর্ণনা করা গেলেও, পরিষ্কার চিত্রটা কখনই তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাইলে কি ভাষা দিয়া কিছুতেই সত্যিকার ভাবের আদান প্রদান সম্ভব না? যুগ যুগ ধরে মানুষ তাহলে কি করে আসতেছে? উত্তর হইলো, ভাষা শুধু বাস্তব পৃথিবীতে সাইন পোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হইতে পারে, এবং সেইটাই হয়ে আসিতেছে। এই সাইন পোস্ট দিয়া অনেকটা পূর্ণ কমুনিকেশন বা বোঝা তখনই সম্ভব, যখন মানুষ একে অন্যের সাথে হারমনিয়াসলি কানেক্টেড থাকে বা গভীর আত্মিক সুসম্পর্কে আবদ্ধ  হয় যেইখানে তাঁরা শব্দের ব্যবহার ছাড়া অথবা শব্দের বাইরে গিয়া একে অপরের মনের ভাষা বুঝতে পারে। এমনকি  যারা নীরব কথোপকথনের ঝরনা ধারায় আপ্লুত হতে পারে। মানুষের প্রজ্ঞা আর ভালোবাসা মূলত এইভাবেই প্রসারিত করা হয়। আর এভাবেই  মানুষ ভাষার কাঠামোকে ভেঙে অবতীর্ণ হয় নতুন সম্পর্কের বিশালতায়।

কিন্তু সমস্যা হলো, বেশীরভাগ মানুষ অজ্ঞতা আর ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়াতে, মানুষ এই  সম্পর্কের বিশালতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিশলতার কথা ভুলে গেছে। মানুষ এখন এপারেন্ট ভাষাটাকেই বিশাল বাস্তবতা মনে করে। সারা পৃথিবীতে মানুষ সারাক্ষণ শুধু বকবক করে। সবাই কথা বলেই চলেছে। আর এনটায়ার হিউম্যান রেইসের এই টকেটিভন্যাসকে বলা যায় “ল্যাক অব রিয়েল ইনটারেকশ্যান”। সবাই একে অন্যের সাথে ভাবের আদান প্রদান, জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান দান করার সময় ভাষার মাধ্যমে একটা কল্পিত লক্ষ্যহীন অন্তঃসার শূন্য  একটা বিশেষ কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, এই কাঠামো খুব সহজেই তার লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে দীনি শিক্ষা অথবা নৈতিক শিক্ষা যেটার সম্পর্ক মানুষের আভ্যন্তরীণ পরিচর্যার সাথে সেটা শুধু ভাষার কাঠামোতে আবদ্ধ করলে এই শিক্ষা সম্পূর্ণ লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়বে। ফলস্বরুপ জন্ম নিবে প্রাণহীন পৃথিবী। 

এইরকম যখন চলতে থাকে, মানুষ যখন ভাষাকেই সব বাস্তবতার ধারক মনে করে, তখন সে মনের দিক থেকে অস্থির হয়ে উঠে। এই অস্থিরতায়  মানব সমাজকে নিক্ষেপ করে হতাশার অন্ধকারে। এখন তাহলে এই সমস্যার সমাধান কি? সমাধান হলো,  প্রথমে ভাষার ছলনা ও সীমাবদ্ধতাকে বোঝা। দ্বিতীয়ত,  নীরবতারে আপন করা, মাঝে মাঝে নীরবতায় ডুবে যাওয়া। আমরা নীরব থাকলে মহাবিশ্বের প্রবাহটা স্পষ্ট  শুনতে পাব। মহাবিশ্বের ছন্দটারে অনুভব করতে পারব। দিগন্তসমূহে আল্লাহর সাজানো আয়াত সমূহ  দেখতে ও বুঝতে সক্ষম হব। তখন আশেপাশে যা কিছু আছে এবং যারাই আছে, এই সবকিছুর সাথে আমাদের সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি হবে। আমরা তখন  পুরা মহাবিশ্বের সবকিছুর সাথে গভীর ছন্দ ও সম্পর্ক খুজে পাব।  এই সম্পর্ক কোন কথা দিয়া, অথবা ভাষা দিয়া তৈরি হয় না। বরং এই সম্পর্ক  আচার-‌আচরণ,  দায়িত্ব, কর্তব্য, ধৈর্য্য, মহানুভবতা ও ভালবাসা  ইত্যাদির মাধ্যমে রচিত হয়। ত্যাগ-তিতিক্ষা, নিঃস্বার্থপরতা, অভিসারতা এই সম্পর্কের মৌলিক ভাষা। আমাদের অসীম অস্তিত্ব, অনুভূতি, অনুভব ও প্রজ্ঞা  যদি শুধু  কথার কাঠামোতে সীমাবদ্ধ করে ফেলি এর চেয়ে দৈন্যতা আর কি হতে পারে!! 

এখন শেষ প্রশ্ন হইলো, এই যে এত কিছু বললাম। এর সবকিছুর মূল কালপ্রিট কি শুধু ভাষা? উত্তর হইলো, না। তবে ভাষা এইখানে বড় ধরণের ভূমিকা রাখে। সমস্যাটা প্রকট হইয়া দাঁড়ায় তখন, যখন আমরা ভুলে যাই যে ভাষা লিমিটেড। বিখ্যাত স্ক্রিন রাইটার কিম ক্রিজান ভাষার এই লিমিটেশন নিয়া কথা বলছিলেন। তিনি বলছিলেন —

"শুধু সারভাইবালের ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহারটা খুবই সহজ এবং কার্যকরী। যেমন ধরেন, পানি। এই শব্দটা শুনলে আমরা সবাই পানির সাথে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা মিলাইয়া তারপরে বুঝতে পারি ‘পানি’ বলতে কি বুঝায়। কিন্তু বিষয়টা একটু প্যাচ খাইয়া যায় যখন আমরা ভাষার এই সিম্বলগুলা দিয়া কোন Abtract জিনিস বুঝাইতে চাই, যেমন প্রেম,ভালোবাসা, রাগ, ক্ষোভ, আধ্যাত্বিকতা ইত্যাদি। যখন কেউ বলে ‘ভালোবাসা’, তখন যে শুনে সে ভালোবাসার সাথে নিজের যে অভিজ্ঞতা সেইটা দিয়া বুঝে নেয় ভালোবাসা বলতে এখানে কি বুঝানো হইসে। কিন্তু সে কি এক্স্যাক্টলি ভালোবাসা দিয়া এইখানে কি বুঝানো হইছে তা বুঝল? বুঝলে সেইটা ক্যামনে নিশ্চিত হওয়া যাবে? শব্দ দিয়া তা নিশ্চিত হওয়া যাবে না কখনই। কারণ শব্দেরা নিষ্ক্রিয়। এইগুলা শুধুই সিম্বল। শব্দরা মৃত। আমাদের বেশীরভাগ অভিজ্ঞতাই দুর্বোধ্য। অকথ্য। কিন্তু তারপরেও আমরা যখন কথা বলি তখন মনে হয় আমরা কানেকটেড। মনে হয় আমরা একে অন্যের কথা বুঝতে পারছি। যদি এইরকম অনুভূতি হয়, এবং সেইটা যদি সত্যি হয়। তাইলে এইটারে বলা যায় “ফিলিং অব স্পিরিচুয়াল কমুনিয়ন”। এবং এইটার জন্যেই আমরা বাঁচে থাকি।

শেষ কথা হলো, ভাষা শুধুই সিম্বল। এইটা আমাদের সারভাইবালের জন্যে প্রয়োজন। ভাষার এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। ভুলে গেলেই সমস্যা, ভুল বোঝাবুঝি। ভাষার দরকার আছে বলে আল্লাহ মানুষকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন এবং এই জন্যেই আমি এই লেখাটাও ভাষা দিয়াই লিখতেছি। এবং ভবিষ্যতেও লেখব। কিন্তু ভাষা কেবলই ভাষা। এইটা তখনই প্রজ্ঞা ও অসীমানায় পরিণত হইব, যখন আমরা এইটার সাথে আমাদের অনেক কিছুই যেগুলো উপরের দিকে আলোচনা করেছি সেগুলো সহ আরও অজানা কিছু এঙ্গেজ করাতে পারব। তাছাড়া ভাষা কেবলই কতগুলা মৃত শব্দের সমষ্টি বৈ আর কিছুই না। ভাষার কাঠামো ছিন্ন করতে পারলেই আমরা ছোঁয়া পাব প্রজ্ঞা ও সম্পর্কের বিশালতায়!

0 Comments:

Post a Comment