"আমি" কতখানি আমার!


 দীনের ময়দানে অনেক পথনির্দেশকগণ একথার তালিম দেন যে নিজেকে আগে শুদ্ধ করতে হবে বা নিজেকে জানতে হবে। কারণ নিজেকে চিনতে বা জানতে না পারলে আমাদের অনেক সমস্যাই সমাধানের অযোগ্য থেকে যাবে। কিন্তু নিজেকে  চেনার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন পথ বা পদ্ধতির কথা বলেন না। দুই-একজন  যা কিছু বলেন সেটা বড়ই গোঁজামিল ধরনের। নিজেকে চেনা বা জানার জন্য কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে হবে, আমাদের  অবচেতন মনের জগতের খোঁজ-খবর নিতে হবে।আমার রবের সাথে আমাদের সম্বন্ধ কি উদ্ধার করতে হবে । নিজের বাবা-মায়ের বিষয়ে আমাদের  অনুভূতিটা কেমন তা বোঝার চেষ্টা করা। একটু স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে বলুন নিজের অতীত জীবন সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিটা কেমন। যেসব কারণে আমরা রেগে যায় সেসবের একটা তালিকা কি আমাদের আছে বা আমাদের রাগের উৎসই-বা কী তা আমরা খোঁজার চেষ্টা করি?এছাড়া  ঐসব বিষয়ের এমন কোন সুভাবনা মনে কী বিরাজমান থাকে যেগুলো কীনা আমাদের  সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে? আমরা কী ভেবে দেখি যে কোন মুহূর্তগুলোতে আমরা অন্যের সঙ্গে খুবই স্বাভাবিক এবং কোন সময়টায় আমরা  অন্যের সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ করে ফেলি।

আচ্ছা, মানুষ হিসেবে আমরা সবাই নানা সময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভোগি। ভেবে দেখি এই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও চাপ মোকাবেলায় আমরা  কি সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করি, অর্থাৎ কোন্ আত্মোপলব্ধি এই বিভিন্ন  পরিস্থিতির  মোকাবিলা করি। কেউ আমাদের সমালোচনা করলে আমরা কী অনুভূতিতে গ্রহন করি এবং কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি? কোন কাজটি করতে আমরা  সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করি এবং এর পিছনে মূল চালিকা কী? অন্যের কোন বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের  সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে এবং কেন? কোন বিষয়গুলো আমাদের  শিহরিত ও রোমাঞ্চিত করে এবং কেন? কখনো কি ভেবে দেখেছি আমাদের সময়কে কীভাবে ব্যবহার করছি এবং  তার পিছনে মূল প্রেরণা কি? যদি তা না করে থাকি তাহলে এ বিষয়ে আমাদের ভাবনার অনেক কিছু আছে। এগুলো এমন কিছু প্রশ্ন যেসবের উত্তর আমাদের সবারই নিজেকে সচেতনভাবে করা এবং সততার সাথে এর উত্তর  জানা উচিত। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বা বের করতে আমাদের অনেক দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে, অনেক দীর্ঘ সময় ধরে অনেক মেহনত করতে হতে পারে।

যাইহোক, সব মিলিয়ে নিজেকে চেনা বা জানার কাজটা কঠিন। এর কারণ হলো আমরা প্রতিদিন যেসব কাজ করি সেগুলোর অনেকটাই অভ্যাসবশত করি। প্রতিটি কাজ আমরা জেনে-বুঝে চিন্তা-ভাবনা করে সম্পাদন করি না। এর কারণ হলো, আমাদের প্রতিটি কাজ-কর্ম ও আচার-আচরণের বিষয়ে সতর্ক থাকতে গেলে আমাদের মন-মগজকে সদাসচেতন থাকতে হয়। এর বিপরীতে যদি আমরা ভালো মতো চিন্তা-ভাবনা না করে গড্ডালিকা প্রবাহে গাঁ ভাসিয়ে দিতে পারি তাহলে বিষয়টিকে সহজ বলে মনে হয়, মন-মগজের ওপর চাপও কম পড়ে। আমরা বেশিরভাগ মানুষই জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় এভাবেই কাটিয়ে দেই। আমাদের মধ্যে আরেকটি প্রবণতা হলো, আমরা নির্ঝঞ্ছাট থেকে আনন্দ উপভোগ করতে চাই। কোনো কিছুকে অপছন্দীয় ও জটিল বলে মনে হলেই আমরা এর ভালো দিকগুলোর দিকে না তাকিয়েই তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমরা সহজে কোনো কিছুর গভীরে যেতে চাই না।

আসলে আমাদের অবচেতন মনে আমাদের নিজস্ব কিছু প্রত্যাশা, আবেগ ও অনুভূতি মজুদ থাকে যেগুলো আমাদেরকে কোনো কিছুর বিষয়ে গভীর চিন্তা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যদি খুব গভীরভাবে চিন্তা করি তাহলো হয়তো দেখতে পাবো আমরা যে পেশায় আছি অথবা আমরা যে সম্পর্ক বজায় রেখে চলছি তা আমাদের নিজেদেরকে একেবারেই ভুলিয়ে। এমনকি আমাদের চারিপাশের পরিবেশ আমাদেরকে যে ফালতু বিষয়ে ডুবিয়ে রেখেছে যা আমাদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অবমাননাকর। আমাদের মন-মগজ বিশেষকরে অবচেতন মন এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না। এ কারণেই আমরা নিজেদেরকে বেশিমাত্রায় চিনতে বা জানতে আগ্রহী নই। মনো বিশারদদের মতে, এ ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় অর্জিত আমাদের কলুষিত ও অবচেতন মনের কারসাজিই সবচেয়ে বেশি। আমাদের বখে যাওয়া মনোজগতে নিজেকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে দিতে চায় না। কারণ আমরা শৈশব থেকে গভীরভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত নই, নিজেকে জানার চেষ্টা আমাদের মধ্যে ছিল না।

আমাদের অবচেতন মন আমাদের অতীতের সকল অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, জ্ঞান, আবেগ, বিশ্বাস ও দক্ষতাকে ধারণ করে রেখেছে। আমরা অতীতে যা যা করেছি, ভেবেছি বা অর্জন করেছি, সেই সকল তথ্যই মজুদ থাকে অবচেতন মনের কাছে। তাই যদি দেখা যায় যে, আমরা নতুন এমন কিছু করতে যাচ্ছি যা একেবারেই নতুন  এবং আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক, তখনই বেঁকে বসে আমাদের অবচেতন মন। আমরা ইতিমধ্যেই কোনো নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী হলে সহজে যেমন নতুন কোনো আদর্শকে গ্রহণ করতে পারি না, অবচেতন মনও তেমনই তার নিজস্ব আদর্শ হতে বিচ্যুত হতে চায় না। ফলে আমরা খুব সচেতনভাবে কোনো নতুন ধরনের কাজ করতে চাইলেও, অবচেতন মন আমাদের টেনে ধরে রাখে।

যেহেতু অবচেতন মনেই অবস্থান করে আমাদের আবেগ, তাই অবচেতন মন চাইলে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে আমাদের আচার-ব্যবহার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকেও। একবার যদি আমরা কোনো কাজের বিরুদ্ধে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি, তখন আবেগকে চাপা দিয়ে ওই কাজ অব্যহত রাখা হয়ে পড়ে অসম্ভব। যদি আমরা কোনো কাজ করার পেছনে সচেতনভাবে একটি যুক্তি সাজাতে চাই, দেখা যায় ওই সময়ের মধ্যে আমাদের অবচেতন মন সাজিয়ে ফেলেছে বিপক্ষ অবস্থানের দশটি যুক্তি। এভাবে অবচেতন মন আমাদের যুক্তি-বুদ্ধি, আবেগ, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, মেজাজ সবকিছুতেই কলকাঠি নাড়তে পারে। ফলে তার কাছে প্রায়ই হার মানতে বাধ্য হয় আমাদের সচেতন মন।

নিজেকে চেনা বা জানার জন্য অবচেতন মনের পিছুটানকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অবচেতন মনের বিভিন্ন নেতিবাচক আবেগের কারণে আমরা নিজেদেরকে চেনা বা জানার পদক্ষেপ নিতে হয়তো ভয় পাচ্ছি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে আমাদের  সচেতন মনের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে অবচেতন মন বেশি শক্তিশালী রূপে আবির্ভূত হচ্ছে, যার ফলে আমাদের ইচ্ছাটি অবদমিতই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু যদি আমাদের ইচ্ছাশক্তির মাত্রা অনেক বেশি থাকে এবং আমাদের  মানসিকতা গভীরভাবে মহান রবের সাথে সম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত থাকে, তাহলে অবচেতন মনের নেতিবাচক আবেগ আমাদেরকে কোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। 

নবীদের মৌলিক কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো মানুষের অবচেতন মন যেন আল্লাহ্ র ইচ্ছার অনুগত হয়। এটা তখনই সম্ভব যত বেশি আমরা নিজেকে বিশ্লেষিত করব এবং আবিষ্কার করার চেষ্ট অব্যাহত থাকবে । আল্লাহ্ আমাদের সবাইকেই বুঝার ও আমল করার তৌফিক নসিব করুন । আমিন।

0 Comments:

Post a Comment