ইসলামে ভ্রাতৃত্ববোধ


ইসলামে ভ্রাতৃত্ববোধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আর এ ভ্রাতৃত্বের মানদন্ড ঈমান। ভ্রাতৃত্বে বহুবিধ ফায়দা নিহিত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফায়দা হলো এটা আমাদেরকে  আত্মপ্রেম বা আত্মপূজা থেকে উদ্ধার করে। আমরা যত বেশি আল্লাহ্ র জন্য মুসলিমদের বা সমস্ত সৃষ্টিকে ভালবাসব তত বেশি নিজেদের পরিচয়ের পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হতে পারব। এছাড়া শেষ নবির উম্মাহ হিসাবে আমাদের উপর ন্যস্ত দাওয়াতের কাজ যথাযথ সিফত, কর্তব্যের ও অনুভূতির সাথে করতে পারব ইনশাআল্লাহ। তখন আমাদের ইবাদাত ও দাওয়াত পূর্ণতার দিকে ধাবিত হবে। মহান রাব্বুল আগামী মুমিনদের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন-  Al-Hujurat ৪৯:১০

اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ اِخْوَةٌ    

নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। 

আবার,  রাসূল -সাল্লালাাহু আলাইহি ওযাাসাল্লাম- ইরশাদ করেন: “সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে ম’মিনদের দৃষ্টান্ত এক‌ই দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর জ্বর ও অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়”(সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

রাসূল -সাল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- অন্যত্র বলেন: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“একজন মু’মিন অপর মু’মিনের জন্য আয়না স্বরূপ, মুমিন পরস্পর ভাই ভাই। সে তার জমি সংরক্ষণ করে এবং তার অনুপস্থিতিতে তা হেফাযত করে”(জামে’উত তিরমিজি)। মু’মিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তারা যেন সুদৃঢ় প্রাচীরের মত”(সূরা সাফ্ফ: ৪)। তাই মু’মিনদের মধ্যকার পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা সকলের জন্য অনিবার্য।

হযরত মুশফিক আহমদ রহঃ বলতেন- দীন দুই জিনিসের সমষ্টি; এক ইবাদাত, দুই দাওয়াত। ইবাদাতের প্রাণ আল্লাহ্ র ভালবাসা  আর দাওয়াতের প্রাণ মানুষের প্রতি ভালবাসা। এক সাহাবী এসে রাসুলুল্লাহর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ দীন কী? উত্তরে আল্লাহ্ র রাসুল বললেন- দীন হলো হিতকামনা। সুতারং একজন মুসলিম অপর মুসমি ভাইয়ের জন্য সর্বদা কল্যাণকামী ও সহযোগিতার মানসিকতা সম্পন্ন হবে। আর এ সম্প্রীতি ও সহযোগিতার সীমারেখা তাকওয়া এবং কল্যাণের পথে, ন্যায় ও বৈধ কাজে। 

কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে: “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়াার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে সহযোগিতা করবে না”(সূরা মায়েদা:০২)। ন্যায় ও কল্যাণের বিষয়ে নিজ কওমকে সাহায্য করা অন্যায় সম্প্রদায়প্রীতি নয়; বরং ঈমানের দাবী। আর জুলুম ও অন্যায় কাজে নিজ ক‌ওমের অন্ধ পক্ষপাতিত্ব করাই নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িকতা। রাসূল-সাল্লাল্লাাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আসাবিয়াত’ তথা সাম্প্রদায়িকতা কী? তিনি উত্তরে বলেন, আসাবিয়াত হল নিজ সম্প্রদায়কে তার অন্যায়-অবিচারে সাহায্য করা (সুনানে আবু দাউদ)। তাই অন্যায়ের ক্ষেত্রে অন্ধ পক্ষপাতই সাম্প্রদায়িকতা, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসের ভাষায়: “যে ব্যক্তি আসাবিয়াতের দিকে ডাকে বা আসাবিয়াতের কারণে যুদ্ধ করে বা আসাবিয়াতের ওপর মৃত্যুবরণ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়”(সুনানে আবু দাউদ)। অতএব ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হল, তাকওয়া ও কল্যাণের কাজে এবং ন্যায় ও ইনসাফের পথে মুসলমানগণ পরস্পরকে সমর্থন ও সহযোগিতা করবে। নিজেদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখবে, তবে যেকোনো অন্যায়ের পক্ষাবলম্বন ও সহযোগিতা হতে নিজকে বিরত রাখবে। রাসূল (সা.) এর বাণী: হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“তোমার ভাইকে অত্যাচারী ও অত্যাচারীত অবস্থায় সাহায্য কর। তখন জনৈক সাহাবী (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে রাসূল (সা.) তাকে অত্যাচারীত অবস্থায় আমি সাহায্য করব; কিন্তু অত্যাচারী হলে কিভাবে সাহায্য করব? জবাবে রাসূল (সা.) বলেন, তুমি তাকে অত্যাচার করা হতে বিরত রাখবে। আর এটাই তাকে সাহায্য করা” (সহীহুল বুখারী)।

ন্যায় ও কল্যাণের কাজে একজন মু’মিন অপর মু’মিন ভাইয়ের জন্য স্বীয় স্বার্থ বিসর্জনেও উৎসাহিত করে। ইসলামের সূচনালগ্নে মক্কার মুসলিমগণ যখন কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন,আপন গোত্রের অবিচার ও নিপীড়নে নিজেদের জন্মস্থান ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন মদীনার মুসলমানগণ সহযোগিতা ও সহানুভূতির এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যার দ্বিতীয় নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা নিজেদের প্রয়োাজন ও দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও সহায়-সম্বল এবং আপনজন বিহীন মুহাজির মুসলিমগণের জন্য ধন সম্পদ ও আপন স্বার্থ ত্যাগের সমুজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের এ গুণ পছন্দ করে আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন: ٌ“আর তারা (আনসার) তাদেরকে (মুহাজির) নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও” (সূরা হাশর:০ ৯)। আল্লাহ তা’আলা জান্নাতের বিশেষ কিছু নি’আমত উল্লেখপূর্বক এসকল নে’আমতের অধিকারীগণের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন: “খাবারের প্রতি আসক্তি (প্রয়োজন) থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম, ও বন্ধীদের খাবার দান করে” (সূরা দাহর: ৮-৯)।

ইসলামী ভ্রাতৃত্বের গন্ডি কোন স্থান, কাল, ভাষা, গোত্র বা বর্ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গোটা বিশ্বের সকল স্থানের মুসলমানগণই পরস্পর ভাই ভাই। আর তাই একজন মু’মিন হিসেবে অপর মু’মিন ভাইয়ের জন্য নিজ দেশে যেমনি কর্তব্য রয়েছে,তেমনি দেশ,জাতি, ভাষা, গোত্র ও বর্ণের সীমানার বাহিরেও কিছু করণীয় রয়েছে। নিম্নে মুসলিমগণের পারস্পরিক কিছু মৌলিক গুণাবলী ও করণীয়  উল্লেখ করা হলো-

আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে একজন মু’মিন অপর মু’মিনকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসবে যতটা একজন মুমিন নিজেকে যেমন ভালবাসে। পরিচিত/ অপরিচিত সকলে মধ্যে সালাম ও মেহমানদারির অনেক প্রসার ঘটানো। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমাদেরকে যখন অভিবাদন করা হয় তখন তোমরাও উহা অপেক্ষা উত্তম অভিবাদন করবে বা উহারই অনুরূপ করবে”(সূরা নিসা:৮৬)। রাসূল (সা.) বলেন: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত. তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনয়ন করবে, আর ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনয়ন করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কী তোমাদেরকে এমন বিষয়ে বলে দেবনা যা সম্পাদন করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে? আর তাহলো তোমরা নিজেদের মাঝে সালাম বিনিময় কর” (সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণা ও গীবত হতে পুরোপুরি বিরত থাকা। কুরআনুল কারীমের ভাষায়: “হে মু’মিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে বেঁচে থাক; কেননা অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ। এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং অপরের পশ্চাতে গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কী তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? বস্তুত তোমরা তা ঘৃণা কর”(সূরা হুজুরাত: ১২)।

ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় পারস্পরিক গালি-গালাজ ও ঝগড়া-বিবাদ হতে বিরত থাকা কারণ এটা মুমিনের শানের খেলাপ যে কোন ব্যক্তিগত কারণে অপর ভাইয়ের সাথে খারাপ আচরণ করা। হাদীসের ভাষায়: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন: মুসলিমদের পারস্পরিক গালি দেয়া ফাসেকী এবং হত্যা করা কুফুরী”(সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্বের একটি দিক হলো- প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পরস্পরকে সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়ানো এবং সামর্থানুযায়ী সাহায্য ও সহযোগিতা করা; আল্লাহ তা’আলার ভাষায়: “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়াার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করবে”(সূরা মায়েদা: ০২)।

ভ্রাতৃত্বের আরেকটি দাবি হলো ছোট-খাটো মতানৈক্যের কারণে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি না করা এবং অতীত ও বর্তমান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক ঐক্য সুসংহত করা।  এমনকি যদি প্রয়োজন হয়- ঐক্য সম্পাদনে স্বীয় পদ-পদবীর মোহ ত্যাগ করে অন্যকে প্রাধান্য দেয়ার মানসিকতা পোষণ করা। অপর মু’মিনের দু:খ-কষ্ট লাঘবে চেষ্টা করা ও ব্যথায় ব্যথিত হওয়া। রাসূল (সা.) বলেন: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:“যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোন মু’মিনের কষ্ট দূর করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কষ্ট দূর করবেন..”(সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিফাত হলো, নিজের জন্য যা পছন্দ অপর মু’মিনের জন্যও তা পছন্দ করা; এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) এর বাণী: হযরত আনাস (রা.) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:“তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত ঈমানদার হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার অপর ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ না করে”(সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির বড় নিয়ামক হলো  অপরের জন্য দু’আ করা এবং  পারস্পরিক হাদিয়া বিনিময় করা। রাসূল (সা.) বলেন: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:“তোমরা পরস্পর হাদিয়া বিনিময় করবে এতে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা (সুসম্পর্ক) তৈরী হবে”(সহীহুল বুখারী)।

পরিশেষে বলব, ভ্রাতৃত্ববোধ ইসলামে সভ্যতার সবচেয়ে দৃশ্যমান অনিন্দ্য সৌন্দর্য  যেখানে  অন্য সব সভ্যতা করুণভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। এজন্য ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীসের এত বেশি জোর তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। তাইতো রাসূল (সা.) বলেন:“মু’মিনগণ যেন একটি প্রাচীর, যার একটি ইট আরেকটিকে শক্তি যোগায়”(সহীহুল বুখারী)। আমরা ভেবে দেখি কী হওয়ার ছিলো!! আর কী চলিতেছে! আল্লাহ্ আমাদের সবাইকেই বুঝার ও আমল করার তৌফিক নসিব করুন । আমিন।

মোঃ আব্দুর রহমান 
গবেষক

0 Comments:

Post a Comment