শিক্ষা কারিকুলামে শিশুদের মনস্তত্ত্বের গুরুত্ব
আমরা সাধারণ মানুষেরা কোনো কিছুর গভীরে না গিয়ে বা উপলব্ধি না করেই নিজের কমন সেন্স দিয়ে সবকিছুতেই একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই। এটা সুস্থ ও সর্বাঙ্গীন সমাজের ধারা নয়। সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিথস্ক্রিয়া হলো শিক্ষক - ছাত্রের সম্পর্ক। এই মিথস্ক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে, বিশেষকরে শিক্ষকদের, জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যারা স্কুল শিক্ষায় অগ্রগামী, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক থাকে খুবই প্রাণবন্ত ও বন্ধুসুলভ। ঠিক বিপরীতে আমাদের অঞ্চলের শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে একজন প্রশাসক কিংবা জেনারেলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আমাদের শিশুরা শিক্ষকের ভয়ে তটস্থ থাকে আর শিশুদের এই মানুষিক অবস্থা সৃষ্টিশীলতাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। জীবনের শুরুতে যে শিশু ভয়ের সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বড় হয় তাদের জন্য সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজের নেতৃত্ব দেওয়া সুকঠিন।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি শিশুদের মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে বুঝা। সেজন্য শিশুমনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি না করতে পারলে কখনোই একজন শিক্ষক শিশুদের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারবে না। বরং সে শিক্ষক হয়ে উঠবে স্বৈরাচারী এবং সে নিজের বয়স্ক মন দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনের উপর চালাবে তীক্ষ্ণ তরবারি।
আমরা গতানুগতিকতাকে খুব বেশি ভালবাসি। আমরা যেভাবে দেখেছি, পেয়েছি বা করেছি সেইমতো আমরা চাই, নতুনত্বকে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে ব্যাপক অনীহা। কারণ গতানুগতার মধ্য আমরা একটা কমফোর্টনেস কাজ করে । আর একারণেই আমরা তৃতীয় বিশ্ব বিশেষকরে মুসলিমরা পৃথিবীতে সামষ্টিক ভাবে একেবারেই ব্যাক-বেন্সার। আমরা শিক্ষকেরা গম্ভীর , রূঢ় ও বদমেজাজি হওয়াটাই মনে করি ভাল ও মহান শিক্ষকের গুণাবলী। আমদের নিজেদের মুখে যেমন প্রাণবন্ত হাসি থাকে না আর না আমরা আমাদের অনিন্দ্য সুন্দর ফুলগুলোর মুখে হাসি বা আনন্দ দেখতে চাই। কী যালেম আমরা !
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যা নিয়ে কথা না বলে আমরা আছি অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে। এক জরিপে দেখলাম বাংলাদেশের শিশুরা সবচেয়ে কম শারীরিক অ্যাকটিভিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্কুলে শুধু বর্ণ মুখস্থের বাইরে তাদের আর কোনো শারীরিক অ্যাকটিভিটি বা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কোনো অ্যাকটিভিটি নেই। যেখানে জাপান, চীন ও অন্যান্য উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শারীরিক কারিকুলাম, কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে; সেখানে আমরা তাদের তুলনায় পড়ে আছি আদিম বর্ণ মুখস্থ প্রথায়।
পৃথিবীর সব দেশ যেখানে কমিউনিটি ও শারীরিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রসর সেখানে আমরা আছি তথাকথিত প্রাচীন ধারায় যা শত বছর পূর্বে তখনকার শিশুদের মনও মনন অনুযায়ী। আমাদের শিক্ষকরা সেই আদি কায়দায়ই বাচ্চাদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, কোনো নতুনত্ব নেই, কোনো ভেরিয়েশন নেই। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনত্ব আনতে হবে শিক্ষা পদ্ধতিতে। শুধু সার্টিফিকেট নামক কাগজ অর্জনভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে টিকে থাকাটা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। এ লক্ষ্যে শিক্ষকদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণসহ বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও তাদের এসব বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে; যাতে তারা বাচ্চাদের এসব বিষয়ে সঠিকভাবে শিক্ষা প্রদান করে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তুলতে পারে।
অভিভাবক যারা আছেন তাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে, ভবিষ্যৎ পৃথিবী সম্পর্কে। শুধু স্কুলের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা মুখ ঢেকে বসে থাকলে হবে না। মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর প্রথম স্কুল তার পরিবার ও মা-বাবা হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা যায়- উন্নত দেশগুলোতে বাচ্চাদের ওপর নানা ধরনের গবেষণা চালিয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও চাওয়া-পাওয়ার ওপরে তাদের পাঠ্যসূচি নির্মিত হয়, যা ইচ্ছে তাই চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই সেখানে। কারণ তারা এটা খুব ভালোভাবেই জানে যে, এ শিশুরাই বড় হয়ে দেশের ভার কাঁধে নেবে। তাই যাচ্ছেতাই তাদের পড়া আকারে খাওয়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই আমাদের দরকার সবার একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা যেন আমরা পেতে পারি একটি ভালো ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, যা আমাদের বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে ইনশাআল্লাহ।


0 Comments:
Post a Comment